বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ খাতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হলো। ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধের সুযোগ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।
এই সংশোধনের মাধ্যমে একদিকে যেমন নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও গোপনীয়তা সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থায় আনা হয়েছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনি নিয়ন্ত্রণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)–এর স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন-কীভাবে iOS 26 আপডেট করবেন?
ইন্টারনেট শাটডাউন আর নয়: ধারা ৯৭–এর ঐতিহাসিক সংযোজন
সংশোধিত অধ্যাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত এসেছে ধারা ৯৭–এর মাধ্যমে। এই ধারায় স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে—
ইন্টারনেট বা কোনো ধরনের টেলিযোগাযোগ সেবা কখনোই বন্ধ করা যাবে না।
এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো প্রশাসনিক আদেশ, জরুরি অবস্থা বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশব্যাপী কিংবা আংশিকভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করার সুযোগ আইনগতভাবে বন্ধ হয়ে গেল।
এটি নাগরিকের তথ্য অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ডিজিটাল অর্থনীতি ও জরুরি সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০১০ সালের বিতর্কিত কাঠামো থেকে সরে আসা
এই সংশোধনের মাধ্যমে সরকার ২০১০ সালের বিতর্কিত সংশোধনী কাঠামো থেকে সরে এসে নতুন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রক কাঠামো গঠন করেছে।
কী পরিবর্তন এলো?
-
মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির ক্ষমতার মধ্যে স্পষ্ট ভারসাম্য আনা হয়েছে।
-
সব লাইসেন্স মন্ত্রণালয়ের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকার প্রথা বাতিল।
-
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্স ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টাডির ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেবে।
-
অন্যান্য সব লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষমতা পুনরায় বিটিআরসির কাছে ন্যস্ত।
এর ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পেশাদারিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা বাড়বে।
বিটিআরসির জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে নতুন ব্যবস্থা
সংশোধিত আইনে বিটিআরসিকে আরও জবাবদিহিমূলক করতে একাধিক বাধ্যতামূলক বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন যেসব ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে:
-
প্রতি চার মাসে একবার গণশুনানি আয়োজন বাধ্যতামূলক।
-
গণশুনানির সিদ্ধান্ত ও ফলোআপ বিটিআরসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
-
কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট রোধে আলাদা ধারা সংযোজন (ধারা ৮৭)।
-
লাইসেন্স আবেদন থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময়সীমা কমানো।
-
অযৌক্তিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক জরিমানা কমিয়ে আনা।
সরকারের মতে, এসব পদক্ষেপ টেলিযোগাযোগ খাতে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে।
নাগরিক গোপনীয়তা সুরক্ষায় বড় পরিবর্তন
নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় সংশোধিত আইনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য ধারা:
-
ধারা ৭১:
সিম ও ডিভাইস রেজিস্ট্রেশনের তথ্য ব্যবহার করে কোনো নাগরিককে নজরদারি, হয়রানি বা অপব্যবহার করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। -
ইমেজ ও ভয়েস প্রোটেকশন নিশ্চিত করা হয়েছে।
-
সিম ডেটা ও ডিভাইস ডেটা সুরক্ষার স্পষ্ট বিধান যুক্ত।
এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্পিচ অফেন্স’ ধারা সংশোধন: মতপ্রকাশে স্বস্তি
বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘স্পিচ অফেন্স’ সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫–এর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা হয়েছে।
এখন কী অপরাধ?
-
কেবল সহিংসতার সরাসরি আহ্বান অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে (ধারা ৬৬ক)।
এর ফলে সমালোচনা, মতামত বা ভিন্নমত প্রকাশ আর সহজে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।
এনটিএমসি বিলুপ্ত, গঠিত হলো সিআইএস
এই সংশোধনের মাধ্যমে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার (NTMC) বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে (ধারা ৯৭)।
এর পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত হচ্ছে—
সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট (CIS)
-
কোনো ইন্টারসেপশন নিজে পরিচালনা করবে না।
-
কেবল কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে।
-
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশের মানদণ্ড অনুসরণ করবে।
-
রোল–বেজড অ্যাক্সেস কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু থাকবে।
আইনানুগ ইন্টারসেপশন: কড়া নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা
নতুন আইনে আইনানুগ নজরদারির সংজ্ঞা ও পরিধি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
কখন ইন্টারসেপশন করা যাবে?
-
জাতীয় নিরাপত্তা।
-
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা।
-
জরুরি প্রাণরক্ষা।
-
বিচারিক ও তদন্ত কার্যক্রম।
-
আন্তঃসীমান্ত অপরাধ।
👉 এসব ক্ষেত্রেও আধা–বিচারিক কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া কোনো ইন্টারসেপশন সম্ভব নয়।
আধা–বিচারিক কাউন্সিল ও সংসদীয় তদারকি
আইনানুগ ইন্টারসেপশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে—
আধা–বিচারিক কাউন্সিল
-
বেআইনি ইন্টারসেপশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করবে
-
সদস্যরা:
-
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী (সভাপতি)।
-
প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার।
-
স্বরাষ্ট্র সচিব।
-
সংসদীয় নজরদারি
-
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
-
প্রতি বছর জাতীয় বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
-
ইন্টারসেপশন ক্ষেত্র, বাজেট ও সক্ষমতার তথ্য প্রকাশ থাকবে।
আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য
সরকার জানিয়েছে, এই সংশোধিত অধ্যাদেশ—
-
জাতিসংঘের নীতিমালা।
-
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (ITU)।
-
বৈশ্বিক উত্তম অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এতে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাত আরও গণতান্ত্রিক, মানবাধিকার–বান্ধব ও বিনিয়োগযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপসংহার
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ শুধু একটি আইনি পরিবর্তন নয়—এটি ডিজিটাল বাংলাদেশে নাগরিক অধিকার, গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এক নতুন অধ্যায়।
ইন্টারনেট শাটডাউন নিষিদ্ধ, নজরদারিতে জবাবদিহিতা, বিটিআরসির স্বাধীনতা এবং স্পিচ অফেন্সের সীমিত সংজ্ঞা—সব মিলিয়ে এই আইন টেলিযোগাযোগ খাতে একটি যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হবে।
আরও পড়ুন-Apple iPhone 17 Pro সর্বশেষ প্রতিবেদনে নতুন মোড়
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔


