ইসলামের ইতিহাসে কিছু রাত আছে, যেগুলো শুধু একটি তারিখ নয়—বরং ঈমান, অনুভূতি ও আত্মিক জাগরণের এক অনন্য অধ্যায়। ঠিক তেমনই একটি মহিমান্বিত রাত হলো শবে মেরাজ। এই রাত মুসলমানদের কাছে শুধু স্মরণীয় নয়, বরং হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনার এক গভীর সুযোগ।
বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে শবে মেরাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। মসজিদে মসজিদে আলোচনা, দোয়া মাহফিল, নফল নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে এই রাত কাটানো হয়। তবে অনেকেই সঠিকভাবে জানেন না—এই রাতের প্রকৃত ফজিলত কী, কী আমল করা উচিত, আর কোন বিষয়গুলো শুধু প্রচলিত কিন্তু প্রমাণভিত্তিক নয়।
আরও পড়ুন-আল্লাহ যে ৫ নীরব আমল সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন
শবে মেরাজ ২০২৬ কবে?
হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শবে মেরাজ পালিত হয় ২৭ রজব রাতে।
👉 ২০২৬ সালে শবে মেরাজ পালিত হবে ১৬ জানুয়ারি (শুক্রবার) দিবাগত রাতে।
তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামি তারিখ চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশে স্থানীয় চাঁদ দেখার ঘোষণার ভিত্তিতে তারিখ একদিন কম-বেশি হতে পারে।
শবে মেরাজ কী? (ইসরা ও মেরাজের ঘটনা)
শবে মেরাজ মূলত দুটি অংশে বিভক্ত—
-
ইসরা: মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর
-
মেরাজ: বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে সপ্তম আকাশ অতিক্রম করে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছানো
এই রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর বিশেষ কুদরতে বোরাক নামক বাহনে চড়ে প্রথমে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় যান। এরপর তিনি আকাশের স্তরসমূহ অতিক্রম করেন, বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আল্লাহর সঙ্গে বিশেষ সম্মানজনক সাক্ষাৎ লাভ করেন।
এই ঘটনা শুধু একটি অলৌকিক সফর নয়—বরং এটি প্রমাণ করে, আল্লাহ যাকে চান তাকে সীমার ঊর্ধ্বে তুলে নিতে পারেন।
নামাজ ফরজ হওয়ার মহিমান্বিত ঘোষণা
শবে মেরাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপহার হলো—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়া।
প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারিত হলেও, রাসূল ﷺ-এর আবেদন ও আল্লাহর রহমতে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করা হয়, কিন্তু সওয়াব রাখা হয় পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান।
এ থেকেই বোঝা যায়—
নামাজ শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি উপহার।
শবে মেরাজের ফজিলত
শবে মেরাজের ফজিলত মূলত এর ঘটনার মহিমার মধ্যেই নিহিত। এই রাত আমাদের শিক্ষা দেয়—
-
আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার
-
নামাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করার
-
দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার
-
গুনাহ থেকে ফিরে আসার
এটি কোনো নির্দিষ্ট রাতের ইবাদত বাধ্যতামূলক করা হয়নি, তবে এই রাতকে কেন্দ্র করে নেক আমলে মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত উত্তম।
শবে মেরাজে করণীয় আমল
এই রাতে বিশেষ কিছু আমল করলে আত্মিক প্রশান্তি ও নেকি অর্জনের সুযোগ হয়।
১. নফল নামাজ আদায়
দুই রাকাত, চার রাকাত বা তাহাজ্জুদ আদায় করা যেতে পারে। নামাজে মনোযোগ দিয়ে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার অনুভূতি তৈরি করা উচিত।
২. কোরআন তেলাওয়াত
বিশেষ করে সূরা ইসরা, সূরা নাজম, সূরা বনি ইসরাইল পাঠ করা যেতে পারে।
৩. তওবা ও ইস্তিগফার
নিজের গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা এই রাতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
৪. দোয়া
নিজের জন্য, পরিবার, দেশ, উম্মাহ এবং আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা।
৫. দরুদ শরিফ
রাসূল ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ করা এই রাতে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
শবে মেরাজের কিছু সুন্দর দোয়া
আপনি চাইলে এই দোয়াগুলো পড়তে পারেন—
রাব্বিগফিরলি ওয়ারহামনি ওয়া তুব আলাইয়া।
হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন এবং আমার তওবা কবুল করুন।
আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।
হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।
শবে মেরাজে রোজা রাখার বিধান
শবে মেরাজ উপলক্ষে নির্দিষ্ট রোজার কোনো সহিহ হাদিসভিত্তিক বাধ্যবাধকতা নেই। তবে কেউ নফল ইবাদতের নিয়তে রোজা রাখলে তা নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে।
শবে মেরাজ সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা
অনেক সময় সমাজে দেখা যায়—
-
নির্দিষ্ট ১২ রাকাত নামাজ বাধ্যতামূলক মনে করা।
-
নির্দিষ্ট দোয়া ছাড়া অন্য দোয়া কবুল হয় না ভাবা।
-
শুধুই অনুষ্ঠানভিত্তিক পালন করা।
ইসলামে ইবাদত সহজ ও আন্তরিক হওয়াই আসল বিষয়।
শবে মেরাজের নামাজের নিয়ত
শবে মেরাজ উপলক্ষে ইসলামে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা বিশেষ ওয়াজিব নামাজ নির্ধারিত নেই। তবে এই রাতে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা অত্যন্ত উত্তম আমল। মুসলমানরা সাধারণত দুই রাকাত বা চার রাকাত করে নফল নামাজ আদায় করে থাকেন।
শবে মেরাজের নফল নামাজের নিয়ত (বাংলা)
আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শবে মেরাজের দুই রাকাত নফল নামাজ আদায়ের নিয়ত করলাম, আল্লাহু আকবার।
আরবি ভাষায় নিয়ত মনে মনে করলেই যথেষ্ট। মুখে উচ্চারণ বাধ্যতামূলক নয়। নামাজে সূরা ফাতিহার পর যেকোনো সূরা পড়া যায়। নামাজ শেষে দরুদ শরিফ, ইস্তিগফার ও দোয়ার মাধ্যমে ইবাদত সম্পন্ন করা উত্তম।
এই রাতে নামাজের মাধ্যমে মূল উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, নিজের জীবন সংশোধনের অঙ্গীকার করা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
শবে মেরাজের রোজা কয়টি
শবে মেরাজ উপলক্ষে ইসলামে নির্দিষ্ট সংখ্যক রোজা বাধ্যতামূলক হিসেবে প্রমাণিত নয়। সহিহ হাদিসে শবে মেরাজের জন্য বিশেষ কোনো রোজা ফরজ বা সুন্নত হিসেবে নির্ধারিত হয়নি।
তবে—
-
কেউ চাইলে ২৭ রজব দিনে নফল রোজা রাখতে পারেন।
-
এটি নেক নিয়তে রাখলে নফল ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।
-
কিন্তু এটিকে অবশ্য পালনীয় মনে করা সঠিক নয়।
অর্থাৎ, শবে মেরাজ উপলক্ষে রোজা একটি ঐচ্ছিক নফল আমল, বাধ্যতামূলক কোনো বিধান নয়।
রোজার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মসংযম এবং ইবাদতে মনোযোগ বৃদ্ধি করা।
প্রশ্ন–উত্তর
প্রশ্ন ১: শবে মেরাজ কি ফরজ ইবাদতের রাত?
না, এটি ফরজ ইবাদতের রাত নয়, তবে নফল ইবাদতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন ২: এই রাতে কি দোয়া বেশি কবুল হয়?
আল্লাহ সব সময়ই দোয়া শোনেন। তবে এই রাত আত্মিকভাবে দোয়ার জন্য খুবই উপযোগী।
প্রশ্ন ৩: শবে মেরাজে কী ধরনের নামাজ পড়া উচিত?
যেকোনো নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ বা দুই রাকাত করে নফল নামাজ পড়া উত্তম।
প্রশ্ন ৪: এই রাতে কী বিশেষ আমল করা উচিত?
নামাজ, কোরআন, দরুদ, দোয়া ও তওবা—এই পাঁচটি আমল সবচেয়ে উত্তম।
প্রশ্ন ৫: শবে মেরাজের শিক্ষা কী?
নামাজের গুরুত্ব, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক এবং আখিরাতের প্রস্তুতি।
উপসংহার
শবে মেরাজ আমাদের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক রাত নয়—বরং এটি একটি আত্মিক সফরের রাত। এই রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যতই সীমাবদ্ধ হোক, আল্লাহ চাইলে তাকে আকাশের ঊর্ধ্বে তুলে নিতে পারেন।
এই রাতে আমরা যদি নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি, তাহলে শবে মেরাজ আমাদের জীবনে সত্যিকার অর্থেই মেরাজ হয়ে উঠতে পারে।
আসুন, এই শবে মেরাজে আমরা শুধু অনুষ্ঠান নয়—বরং হৃদয় দিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাই।
আরও পড়ুন-অলৌকিক ভাবে দোয়া কবুলের আমল
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔


