শাবান মাস ইসলামের একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মাস। এর পূর্ণ নাম ‘আশ শাবানুল মুআজ্জাম’, অর্থাৎ মহিমান্বিত শাবান। এটি রজবের পর এবং রমজানের আগের মাস। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দুই মাসে বিশেষভাবে নফল ইবাদত ও রোজা পালনে গুরুত্ব দিতেন, যেন রমজানের জন্য আত্মিক ও শারীরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।
শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যা শবে বরাত নামে পরিচিত, মুমিন হৃদয়ে বিশেষ এক অনুভূতি সৃষ্টি করে। কারণ, তখন রমজান আর মাত্র ১৫ দিনের দূরত্বে। এই সময় মুমিনের অন্তরে একদিকে প্রশান্তি, অন্যদিকে ভয় ও আশা—দুটোই কাজ করে। ভয় এই কারণে যে, রমজান যেন কোনোভাবে হাতছাড়া না হয়ে যায়।
আরও পড়ুন-রমজানের প্রথম রাতে আসমানে যে চারটি মহিমান্বিত ঘোষণা দেওয়া হয়
শাবান কেন রমজানের প্রস্তুতির মাস
রমজান হঠাৎ এসে পড়ে না; বরং শাবান মাসই হলো রমজানের প্রস্তুতির সেতুবন্ধন। এই মাসে নফল ইবাদত, রোজা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মনের জমিন প্রস্তুত করা হয়, যাতে রমজানে ফরজ রোজা, তারাবিহ, তাহাজ্জুদ ও কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে পূর্ণ ফসল ঘরে তোলা যায়।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন,
“মুমিনরা, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে সফল হতে পারো।”
(সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
রমজানের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত
১. রমজানের আগেই তওবা করা
তওবা করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য সব সময়ই আবশ্যক। তবে রমজানের মতো এক মহান মাসের আগে তওবার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। গুনাহমুক্ত অন্তর নিয়ে রমজানে প্রবেশ করলে ইবাদতে মন বসে এবং প্রশান্তি আসে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“হে লোকেরা, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো। আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে ১০০ বার তওবা করি।”
(সহিহ মুসলিম: ২৭০২)
২. দোয়ার মাধ্যমে রমজানের প্রতীক্ষা
সালাফে সালেহিনদের জীবনে দেখা যায়, তাঁরা রমজানের জন্য ছয় মাস আগে থেকেই দোয়া করতেন, যেন আল্লাহ তাঁদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। আবার রমজান শেষে পাঁচ মাস দোয়া করতেন, যেন তাঁদের আমল কবুল হয়।
একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর কাছে দোয়া করা—
তিনি যেন সুস্থতার সঙ্গে রমজান পর্যন্ত পৌঁছান, নেক আমলের তাওফিক পান এবং আমল কবুল হয়।
৩. রমজানের আগমনে আনন্দিত হওয়া
রমজান পাওয়া একজন মুসলিমের জন্য আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। এটি কল্যাণের মৌসুম। এ মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ রাখা হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়।
আল্লাহ বলেন,
“বলুন, এটি আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়া। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক।”
(সুরা ইউনুস, আয়াত: ৫৮)
৪. কাজা রোজা আদায় করে নেওয়া
যাঁদের ওপর আগের রমজানের কাজা রোজা রয়েছে, তাঁদের জন্য শাবান মাসই শেষ সুযোগ। আয়েশা (রা.) বলেন,
“আমার ওপর আগের রমজানের রোজা বাকি থাকলে আমি শাবান মাস ছাড়া তা আদায় করতে পারতাম না।”
(সহিহ বুখারি: ১৮৪৯)
৫. ইবাদতে প্রতিবন্ধকতা দূর করা
রমজানে যেসব কাজ ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে—সেগুলো আগেই গুছিয়ে নেওয়া উচিত। এতে রমজানজুড়ে নির্বিঘ্নে ইবাদত করা সহজ হয়।
৬. পরিবারের জন্য ধর্মীয় মজলিস আয়োজন
রমজানের আগে পরিবারকে প্রস্তুত করা অত্যন্ত জরুরি। স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিয়মিত ছোট পরিসরে ধর্মীয় মজলিস করা যেতে পারে, যেখানে রোজা, তারাবিহ, সাহরি, ইফতার, জাকাত ও ইতিকাফের মাসআলা আলোচনা করা হবে।
এতে শিশুদের মধ্যেও রোজার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং পরিবারে ইবাদতের পরিবেশ গড়ে ওঠে।
৭. শাবানে নফল রোজা রাখা
আয়েশা (রা.) বলেন,
“আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে শাবান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।”
(সহিহ বুখারি: ১৮৬৮)
শাবানে কিছু রোজা রাখলে শরীর ও মন রমজানের জন্য প্রস্তুত হয়।
৮. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা
রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। এই মাসে কোরআন তিলাওয়াতের সওয়াব বহুগুণে বাড়ে। একটি হরফের সওয়াব ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“রোজা ও কোরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে।”
(মুসনাদে আহমাদ: ৬৬২৬)
৯. শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি
রমজানের আগে চিকিৎসা ও শারীরিক প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। হঠাৎ রোজা শুরু হলে অনেকের জন্য তা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই আগেই রোজায় অভ্যস্ত হওয়া প্রয়োজন।
১০. বৈষয়িক কাজ গুছিয়ে নেওয়া
রমজানে ইবাদতে মনোযোগ ধরে রাখতে হলে দুনিয়াবি ব্যস্ততা আগেই কমিয়ে নেওয়া দরকার। অফিস, ব্যবসা ও ব্যক্তিগত কাজ যতটা সম্ভব আগেই গুছিয়ে রাখলে রমজানে মানসিক চাপ কমে।
উপসংহার
রমজান কোনো সাধারণ মাস নয়; এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। তাই এই মহান মাস পাওয়ার জন্য শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও বৈষয়িক—সব দিক থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। শাবান মাসই হলো এই প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সময়।
যেভাবে আমরা দুনিয়াবি অনুষ্ঠানের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিই, ঠিক তেমনি রমজানের জন্যও এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছার তাওফিক দেন এবং যথাযথভাবে প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ দান করেন—আমিন।
আরও পড়ুন-জুমার প্রথম ও দ্বিতীয় খুতবা
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










