নামাজ ইসলামের শ্রেষ্ঠ ইবাদতগুলোর একটি। এটি কেবল কিছু নির্দিষ্ট ভঙ্গি বা বাক্যের সমষ্টি নয়; বরং বান্দা ও আল্লাহর মাঝে গভীর আত্মিক সম্পর্কের প্রকাশ। নামাজের প্রতিটি রুকন—কিয়াম, রুকু, সিজদা ও বৈঠক—সবকিছুতেই রয়েছে আল্লাহর প্রতি বিনয়, আত্মসমর্পণ ও প্রার্থনার ভাষা।
নামাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনেক সময় অবহেলিত অংশ হলো দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকে পড়া দোয়া। রাসুলুল্লাহ ﷺ এই দোয়াটি নিয়মিত পড়তেন এবং সাহাবায়ে কেরামদেরও তা শেখাতেন। এই দোয়ায় মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের প্রায় সব প্রয়োজন একত্রে চাওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন-আল্লাহ যে ৫ নীরব আমল সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন
এই লেখায় আমরা জানব—
-
দুই সিজদার মধ্যবর্তী দোয়ার আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ।
-
হাদিসের নির্ভরযোগ্য দলিল।
-
কেন এই দোয়া পড়া গুরুত্বপূর্ণ।
-
চার মাজহাবের ফিকহি বিধান।
-
এই দোয়া নিয়মিত পড়লে জীবনে কী পরিবর্তন আসে।
দুই সিজদার মধ্যবর্তী দোয়া (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ)
📖 আরবি দোয়া
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَاهْدِنِي وَاجْبُرْنِي وَارْزُقْنِي وَارْفَعْنِي
🔊 বাংলা উচ্চারণ
আল্লাহুম্মাগ্ফিরলী, ওয়ারহামনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়ারযুকনী, ওয়ারফা‘নী
📝 বাংলা অর্থ
হে আল্লাহ,
আমাকে ক্ষমা করুন,
আমার প্রতি দয়া করুন,
আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন,
আমার দুর্বলতা ও ঘাটতি পূরণ করুন,
আমাকে হালাল রিজিক দান করুন
এবং আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।
📚 হাদিসের উৎস ও বিশুদ্ধতা
এই দোয়াটি একাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে—
-
সহিহ ইবন খুজাইমাহ – হাদিস: ৬৯৭
-
সুনানে আবু দাউদ – হাদিস: ৮৫০
-
সহিহ ইবনে হিব্বান
-
সুনানে ইবনে মাজাহ – হাদিস: ৮৯৮
ইমাম নাসাঈ ও শায়খ আলবানি (রহ.) এই হাদিসকে সহিহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন—
“রাসুলুল্লাহ ﷺ দুই সিজদার মাঝখানে এই দোয়া নিয়মিত পড়তেন এবং আমাদেরও শিক্ষা দিতেন।”
কেন দুই সিজদার মধ্যবর্তী দোয়া পড়া হয়?
এই দোয়াটির প্রতিটি শব্দ মানুষের জীবনের গভীর প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
১️⃣ ক্ষমা প্রার্থনা
দোয়ার শুরুতেই বলা হয়— “আল্লাহুম্মাগফিরলী”
কারণ সিজদা হলো বান্দার সর্বোচ্চ বিনয়ের স্তর, আর ক্ষমা চাওয়া সেই বিনয়ের পরিপূর্ণ প্রকাশ।
২️⃣ রহমত কামনা
ক্ষমার পরপরই আল্লাহর দয়া চাওয়া হয়েছে—
কারণ আল্লাহর রহমত ছাড়া মুমিনের কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়।
৩️⃣ হেদায়েত প্রার্থনা
“ওয়াহদিনী” — আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।
নামাজের মূল উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর পথে অবিচল থাকা।
৪️⃣ ভাঙা মন ও দুর্বলতা পূরণ
“ওয়াজবুরনী” শব্দটি অত্যন্ত হৃদয়ছোঁয়া।
এর অর্থ— হে আল্লাহ, আমার ভেঙে যাওয়া দিকগুলো পূরণ করুন।
মানসিক কষ্ট, দারিদ্র্য, হতাশা, জীবনের আঘাত—সবকিছু আল্লাহই পূরণ করতে পারেন।
৫️⃣ হালাল রিজিক
নামাজ শুধু আখেরাত নয়, দুনিয়ার কল্যাণেরও মাধ্যম।
তাই দোয়া করা হয়— “ওয়ারযুকনী” — আমাকে রিজিক দিন।
৬️⃣ মর্যাদা বৃদ্ধি
“ওয়ারফা‘নী” — আমাকে সম্মানিত করুন।
দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্মান লাভের আবেদন।
দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকের ফিকহি বিধান
চার মাজহাবের আলোকে সংক্ষেপে বিধান—
🔹 দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠক ওয়াজিব (হানাফি মাজহাব মতে)।
🔹 শরীর স্থির রেখে বসা সুন্নাহ।
🔹 এই দোয়া পড়া সুন্নাহ মুয়াক্কাদাহ।
🔹 দোয়া না পড়লেও নামাজ শুদ্ধ হয়, তবে সুন্নাহর সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়
এই দোয়া নিয়মিত পড়লে জীবনে যে পরিবর্তন আসে
১. মন শান্ত হয় ও নামাজে একাগ্রতা বাড়ে।
২. আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
৩. রিজিক ও রহমতের দরজা খুলে যায়।
৪. আত্মিক ভরসা ও ধৈর্য বৃদ্ধি পায়।
৫. নামাজের গুণগত মান উন্নত হয়।
৬. দোয়ার শব্দগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।
উপসংহার
নামাজ কোনো যান্ত্রিক ইবাদত নয়; এটি বান্দা ও আল্লাহর হৃদয়সংলগ্ন সম্পর্কের নাম। দুই সিজদার মধ্যবর্তী দোয়া সেই সম্পর্কের অন্যতম গভীর প্রকাশ। এতে বান্দা নিজের দুর্বলতা, চাহিদা, আশা ও আকুতি—সবকিছু আল্লাহর দরবারে তুলে ধরে।
যে ব্যক্তি এই দোয়াটি বোঝার চেষ্টা করে, অনুভব করে এবং নিয়মিত পড়ে, তার নামাজ হয় আরও পরিপূর্ণ এবং তার দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে নেমে আসে আল্লাহর বিশেষ বরকত।
আরও পড়ুন-অলৌকিক ভাবে দোয়া কবুলের আমল
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔


