জুমার নামাজ মুসলমানদের জন্য সাপ্তাহিক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটি। প্রতি শুক্রবার মসজিদে খুতবা শোনা ও জামাতে জুমার নামাজ আদায় করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মুসলমানের জন্য ফরজ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, জুমার নামাজ নিয়ে অনেক মুসল্লির মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে—বিশেষ করে ফরজ নামাজের আগে ও পরে কত রাকাত সুন্নাত পড়তে হয় তা নিয়ে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন মসজিদে কখনো ২ রাকাত, কখনো ৪ রাকাত, আবার কোথাও ৬ রাকাত পর্যন্ত পড়তে দেখা যায়। ফলে অনেকেই প্রশ্ন করেন—
👉 আসলে সঠিক নিয়ম কোনটি?
👉 কম বা বেশি পড়লে কি নামাজ অসম্পূর্ণ হবে?
👉 কোনটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আর কোনটি নফল?
এই পোস্টে কোরআন, হাদিস ও ফিকহের আলোকে বাংলাদেশি মুসল্লিদের জন্য সহজ ভাষায় পুরো বিষয়টি গুছিয়ে তুলে ধরা হলো।
আরও পড়ুন-জুমার দিনে যে দোয়া পড়লে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হয়
জুমার নামাজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জুমার নামাজ শুধু একটি নামাজ নয়, বরং এটি মুসলমানদের সাপ্তাহিক সম্মিলিত ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা কোরআনে সরাসরি জুমার নামাজের নির্দেশ দিয়েছেন। এই নামাজে খুতবা শোনা, আল্লাহর কথা স্মরণ করা এবং জামাতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ঈমান আরও দৃঢ় হয়।
জুমার নামাজের গুরুত্বের কারণে এর নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে জানা খুবই জরুরি। বিশেষ করে ফরজ নামাজের আগে ও পরে সুন্নাত নামাজ আদায়ের বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
জুমার ফরজ নামাজের আগে সুন্নাত কত রাকাত?
👉 জুমার ফরজ নামাজের আগে নির্দিষ্ট কোনো সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নেই।
তবে নফল বা সুন্নাত হিসেবে নামাজ আদায় করা যায়।
হাদিসে স্পষ্টভাবে এমন কোনো বর্ণনা নেই যেখানে নবী ﷺ জুমার আগে নির্দিষ্ট সংখ্যক সুন্নাত নামাজ বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী যুগের আলেমরা জুমার আগে নফল নামাজ আদায় করতেন।
বাংলাদেশে সাধারণত যেভাবে পড়া হয়—
-
খুতবার আগে ৪ রাকাত নামাজ।
এই ৪ রাকাতকে বলা হয়—
-
নফল নামাজ।
-
বা সুন্নাতে গায়রে মুয়াক্কাদা।
অর্থাৎ—
✔ পড়লে সওয়াব পাওয়া যায়।
✔ না পড়লে কোনো গুনাহ হয় না।
জুমার ফরজ নামাজ কত রাকাত?
এই বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই।
👉 জুমার ফরজ নামাজ = ২ রাকাত
এই দুই রাকাত নামাজ—
-
খুতবার পর।
-
ইমামের সঙ্গে।
-
জামাতে আদায় করতে হয়।
এই ফরজ নামাজই জুমার নামাজের মূল অংশ। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে বড় গুনাহ হবে।
জুমার ফরজ নামাজের পরে সুন্নাত কত রাকাত?
এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায়। কারণ হাদিসে একাধিক আমলের বর্ণনা পাওয়া যায়।
হাদিসের আলোকে
কিছু হাদিসে এসেছে—
-
নবী ﷺ জুমার পরে ২ রাকাত নামাজ পড়েছেন।
আবার অন্য হাদিসে এসেছে—
-
নবী ﷺ জুমার পরে ৪ রাকাত নামাজ আদায় করেছেন।
এই কারণেই আলেমরা বলেছেন—দুইটিই সহিহ আমল।
বাংলাদেশে প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য নিয়ম
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী—
-
জুমার পরে ৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পড়া উত্তম।
-
এরপর চাইলে ২ রাকাত নফল পড়া যায়।
অর্থাৎ জুমার পরে মোট ৪ বা ৬ রাকাত পড়া হয়ে থাকে।।
জুমার নামাজের পূর্ণ রাকাত তালিকা
বাংলাদেশে প্রচলিত ও নিরাপদভাবে অনুসরণযোগ্য রাকাত বিন্যাস—
🕌 জুমার নামাজের রাকাত বিন্যাস
-
ফরজের আগে:
-
৪ রাকাত নফল / সুন্নাত (খুতবার আগে)।
-
-
ফরজ:
-
২ রাকাত ফরজ (জামাতে)।
-
-
ফরজের পরে:
-
৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
-
অতিরিক্ত ২ রাকাত নফল (ইচ্ছাধীন)।
-
👉 মোট রাকাত: ১২ রাকাত (ফরজ + সুন্নাত + নফল)
সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কী?
সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হলো—
-
যে সুন্নাত নবী ﷺ নিয়মিত আদায় করতেন।
-
ইচ্ছাকৃতভাবে সবসময় ছেড়ে দেওয়া অনুচিত।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী জুমার পরের ৪ রাকাতকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলা হয়।
খুতবার সময় কী করা উচিত?
খুতবার সময় মুসল্লিদের জন্য কিছু বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—
❌ কথা বলা।
❌ মোবাইল ব্যবহার।
❌ নফল নামাজ শুরু করা।
এসব থেকে বিরত থাকতে হবে।
✔ মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্ব রাখে।
কম রাকাত পড়লে কি নামাজ হবে না?
👉 না, নামাজ সহিহ হবে।
কারণ—
-
ফরজ আদায় হলেই নামাজ পূর্ণ হয়।
-
সুন্নাত ও নফল সওয়াবের আমল।
তবে নিয়মিত সুন্নাত বাদ দেওয়া ভালো নয়।
বাংলাদেশি মুসল্লিদের জন্য কিছু উপকারী টিপস
-
ফরজ নামাজের প্রতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন।
-
সুন্নাত নামাজের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
-
খুতবার সময় পূর্ণ মনোযোগ রাখুন।
-
মসজিদে অযথা তাড়াহুড়া করবেন না।
প্রশ্ন ও উত্তর
জুমার আগে কি ২ রাকাত সুন্নাত আছে?
নির্দিষ্টভাবে নেই, তবে নফল হিসেবে পড়া যায়।
জুমার পরে ২ রাকাত পড়লে কি সমস্যা?
না, হাদিস অনুযায়ী জায়েজ।
জুমার পরে ৪ রাকাত কেন বেশি পড়া হয়?
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
খুতবার সময় নামাজ পড়া যাবে?
না, খুতবার সময় নামাজ পড়া ঠিক নয়।
জুমা না পেলে কী করবেন?
জামাত না পেলে জোহরের ৪ রাকাত ফরজ পড়তে হবে।
উপসংহার
জুমার নামাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ২ রাকাত ফরজ নামাজ। ফরজের আগে ও পরে যে সুন্নাত ও নফল নামাজ আদায় করা হয়, সেগুলো রাসুল ﷺ–এর সুন্নাহ অনুসরণের অংশ এবং সওয়াবের আমল।
সংক্ষেপে মনে রাখুন—
-
আগে: ৪ রাকাত (নফল/সুন্নাত)।
-
ফরজ: ২ রাকাত।
-
পরে: ৪ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা (+ ২ রাকাত নফল)।
ইবাদতে ধারাবাহিকতা ও ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো ইসলামের সৌন্দর্য।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।
আরও পড়ুন-জুমার প্রথম ও দ্বিতীয় খুতবা
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










