বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন একটি নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, সরকারি ভাতা, চাকরি, এমনকি অনেক ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও জন্ম নিবন্ধন অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অনেক মানুষই এখনও সঠিকভাবে জানেন না জন্ম নিবন্ধন করতে কি কি লাগে এবং কোন বয়সে কোন কাগজ প্রয়োজন হয়।
এই লেখায় আমরা ২০২৬ সালের সর্বশেষ নিয়ম অনুযায়ী, জন্ম নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র, নিয়ম ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহজ ভাষায় তুলে ধরবো।
আরও পড়ুন-পুরাতন জন্ম সনদ ডিজিটাল করার নিয়ম (আপডেট)
জন্ম নিবন্ধন কেন এত জরুরি?
জন্ম নিবন্ধন ছাড়া একজন নাগরিক রাষ্ট্রীয়ভাবে পূর্ণ পরিচয় পায় না। জন্ম সনদ না থাকলে—
-
জাতীয় পরিচয়পত্র করা যায় না।
-
পাসপোর্ট পাওয়া যায় না।
-
স্কুলে ভর্তি জটিল হয়।
-
সরকারি ভাতা ও সুবিধা পাওয়া কঠিন হয়।
-
নাগরিক অধিকার প্রমাণে সমস্যা হয়।
এই কারণেই সরকার জন্ম নিবন্ধনকে বাধ্যতামূলক করেছে।
জন্ম নিবন্ধন করতে সাধারণভাবে কি কি লাগে
যে কোনো বয়সের জন্য জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রয়োজন হয়—
-
জন্ম নিবন্ধন আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি।
-
আবেদনকারীর বা শিশুর এক কপি ছবি।
-
পিতা ও মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদের কপি।
-
বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ (হোল্ডিং নম্বর / ওয়ার্ড সার্টিফিকেট / ট্যাক্স রশিদ)।
-
একটি সচল মোবাইল নম্বর।
এর পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী কিছু আলাদা কাগজ লাগে।
বয়সভেদে জন্ম নিবন্ধন করতে কি কি লাগে
০ থেকে ৪৫ দিনের শিশু
এই বয়সে জন্ম নিবন্ধনের জন্য লাগে—
-
হাসপাতালের জন্ম ছাড়পত্র অথবা টিকা কার্ড।
-
পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র।
-
ঠিকানার প্রমাণ।
-
আবেদন ফরম।
এই সময়ের মধ্যে নিবন্ধন করলে প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
৪৬ দিন থেকে ৫ বছর
এই বয়সে জন্ম নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজন—
-
EPI টিকা কার্ড অথবা স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যয়ন।
-
পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র।
-
ঠিকানার প্রমাণ।
-
আবেদন ফরম।
৫ বছরের বেশি বয়স
৫ বছরের বেশি হলে জন্ম নিবন্ধনের জন্য লাগে—
-
স্কুল সনদ (PSC/JSC/SSC যেকোনো একটি) অথবা।
-
চিকিৎসকের বয়স নির্ধারণ সনদ।
-
পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র।
-
ঠিকানার প্রমাণ।
-
আবেদন ফরম।
এই ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বয়স যাচাই করে অনুমোদন দেয়।
জন্ম নিবন্ধনের আবেদন কীভাবে করা হয়
বর্তমানে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন প্রথমে সরকারি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে করা হয়। আবেদন করার জন্য সরকার নির্ধারিত অফিসিয়াল সাইট হলো—
👉 https://bdris.gov.bd
👉 সরাসরি আবেদন লিংক: https://bdris.gov.bd/br/application
ওয়েবসাইটে তথ্য পূরণ করে আবেদন সাবমিট করার পর আবেদন ফরম প্রিন্ট করে স্থানীয় নিবন্ধন অফিসে জমা দিতে হয়। এরপর যাচাই শেষে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদান করা হয়।
জন্ম নিবন্ধন কোথায় সম্পন্ন হয়
জন্ম নিবন্ধনের চূড়ান্ত যাচাই ও সনদ প্রদান করা হয়—
-
ইউনিয়ন পরিষদ।
-
পৌরসভা।
-
সিটি কর্পোরেশন।
-
ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড।
-
বিদেশে জন্ম হলে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট।
জন্ম নিবন্ধন করতে কতদিন লাগে
সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে সাধারণত—
-
৭ থেকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন সনদ পাওয়া যায়।
তবে এলাকা ও অফিসভেদে সময় কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে।
জন্ম নিবন্ধনে সাধারণ যে ভুলগুলো হয়
অনেক আবেদন বাতিল বা ঝুলে যায় এই কারণে—
-
নামের বানান ভুল।
-
জন্ম তারিখ ভুল লেখা।
-
পিতা-মাতার তথ্যের অমিল।
-
ঠিকানা ভুল দেওয়া।
-
অসম্পূর্ণ কাগজপত্র।
এই ভুলগুলো এড়িয়ে চলাই সফল জন্ম নিবন্ধনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করা যায় কি?
হ্যাঁ, জন্ম নিবন্ধনে ভুল থাকলে সংশোধনের সুযোগ আছে। তবে সংশোধনের জন্য—
-
প্রমাণপত্র দিতে হয়।
-
কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগে।
-
একাধিক সংশোধন করলে ভবিষ্যতে জটিলতা হতে পারে।
তাই প্রথমবারেই সঠিক তথ্য দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ টিপস
-
শিশুর নাম নিশ্চিত করে তারপর আবেদন করুন।
-
বাংলা ও ইংরেজি বানান মিলিয়ে নিন।
-
জন্ম তারিখ নিশ্চিত করুন।
-
পিতা-মাতার NID অনুযায়ী তথ্য দিন।
-
জন্ম নিবন্ধনের একাধিক কপি সংরক্ষণ করুন।
জন্ম নিবন্ধন করতে কত টাকা লাগে?
বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধনের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি খুবই সামান্য এবং বয়স ও সময়ের ওপর ভিত্তি করে এই ফি পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে জন্মের পর দ্রুত নিবন্ধন করলে কোনো টাকা লাগে না, তবে দেরিতে করলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিতে হয়।
বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী—
-
জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করলে সাধারণত কোনো ফি লাগে না।
-
৪৫ দিনের পরে জন্ম নিবন্ধন করলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত স্বল্প পরিমাণ ফি দিতে হয়।
-
৫ বছরের বেশি বয়সে প্রথমবার জন্ম নিবন্ধন করলে বয়সভিত্তিক অতিরিক্ত ফি ধার্য হতে পারে।
-
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের ক্ষেত্রে আলাদা ফি প্রযোজ্য হয়।
সাধারণত এই ফি এলাকা ও অফিসভেদে সামান্য ভিন্ন হতে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি ২৫ টাকা থেকে ১০০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে গিয়ে সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত করা সবচেয়ে নিরাপদ।
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জন্ম নিবন্ধনের নামে কোনো দালাল বা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে তা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়া বাড়তি টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ও উত্তর
জন্ম নিবন্ধন ছাড়া কি পাসপোর্ট করা যায়?
না, জন্ম নিবন্ধন ছাড়া পাসপোর্ট করা যায় না।
জন্ম নিবন্ধন ছাড়া কি NID পাওয়া যায়?
না, জন্ম নিবন্ধন ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া যায় না।
বিদেশে জন্ম হলে কি জন্ম নিবন্ধন করা যাবে?
হ্যাঁ, দূতাবাসের মাধ্যমে জন্ম নিবন্ধন করা যায়।
উপসংহার
জন্ম নিবন্ধন শুধু একটি কাগজ নয়, এটি একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি। সঠিক কাগজপত্র, নির্ভুল তথ্য এবং নিয়ম মেনে আবেদন করলে জন্ম নিবন্ধন পাওয়া বর্তমানে খুবই সহজ। তাই ভবিষ্যতের সব নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে জন্ম নিবন্ধন যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করা উচিত।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-৫ মিনিটে জন্ম নিবন্ধন অনলাইন কপি ডাউনলোড করার নিয়ম(আপডেট)
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔


