দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা দৌলতদিয়া যৌনপল্লিতে জন্ম নেওয়া শিশুরা অবশেষে পেল জন্মনিবন্ধনের স্বীকৃতি। আইনি জটিলতা ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে যেসব শিশু বছরের পর বছর ‘পরিচয়হীন’ অবস্থায় বড় হচ্ছিল, তাদের মধ্যে প্রায় ৪০০ শিশু প্রথমবারের মতো জন্মসনদ পেয়েছে।
এই অর্জনের ফলে এখন এসব শিশু অন্যান্য নাগরিকের মতো শিক্ষা, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্যসেবা ও ভবিষ্যতে ভোটাধিকারের মতো মৌলিক সুযোগ পাবে।
আরও পড়ুন-অনলাইনে মৃত্যু নিবন্ধন আবেদনের নিয়ম (আপডেট)
কেন এতদিন জন্মসনদ পাওয়া সম্ভব হয়নি
যৌনপল্লিতে জন্ম নেওয়া অধিকাংশ শিশুর বাবার পরিচয় অজ্ঞাত থাকায় এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকায় সরকারি দপ্তরগুলো এতদিন জন্মনিবন্ধন দিতে অস্বীকৃতি জানাত। ফলে এসব শিশু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে থেকেই বড় হতে বাধ্য হতো।
এই বাস্তবতা বদলাতে সময় লেগেছে কয়েক দশক।
দীর্ঘ আন্দোলনের ফল
পরিচয়হীন শিশুদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের প্রচেষ্টায় এই পরিবর্তন এসেছে। তাদের উদ্যোগে দৌলতদিয়া ছাড়াও দেশের বিভিন্ন যৌনপল্লিতে জন্ম নেওয়া ৭০০-এর বেশি শিশু এখন জন্মনিবন্ধনের আওতায় এসেছে।
এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ফ্রিডম ফান্ড।
সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রোগ্রাম ম্যানেজার খালেদা আক্তার বলেন,
আগে এই শিশুরা নাগরিক অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত ছিল। সমাজ তাদের আলাদা জগতের মানুষ হিসেবে দেখত। জন্মসনদ পাওয়ার মাধ্যমে তারা শুধু আইনি স্বীকৃতিই পায়নি, নিরাপত্তা ও আশার জায়গাও তৈরি হয়েছে।
আইনের অব্যবহৃত ধারাই খুলে দিল পথ
এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে জন্মনিবন্ধন আইনের একটি দীর্ঘদিন অবহেলিত ধারা। ২০১৮ সাল থেকে কার্যকর থাকা ওই বিধানে বাবা-মায়ের পূর্ণ তথ্য ছাড়াও জন্মনিবন্ধনের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তা খুব কম ব্যবহার হতো।
খালেদা আক্তার জানান,
ধারাটি মাত্র কয়েক লাইনের ছিল এবং স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় কর্মকর্তারা প্রচলিত নিয়মেই আটকে ছিলেন। বিষয়টি সামনে আনার পর আমরা সচেতনতা তৈরি করি এবং প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি।
মায়েদের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে সচেতনতা
নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর সহায়তায় শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে আইনি ব্যাখ্যা বোঝাতে ধারাবাহিকভাবে লবিং করা হয়।
এই প্রচেষ্টা এতটাই কার্যকর হয়েছে যে, এখন আর আলাদা প্রচারণার প্রয়োজন পড়ছে না। মায়েরা নিজেরাই একে অন্যকে সন্তানদের জন্মনিবন্ধনের জন্য উৎসাহিত করছেন।
জন্মসনদ না থাকলে ঝুঁকি আরও গভীর
গবেষকদের মতে, জন্মনিবন্ধন না থাকলে শিশুরা শুধু শিক্ষা ও সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হয় না, মানবপাচার ও শোষণের ঝুঁকিও বহুগুণে বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বানিশান্তা যৌনপল্লি নিয়ে করা এক গবেষণার সহলেখক সাব্বির হোসেন জানান, আগে অনেক পরিবার সন্তানদের পরিচয় নিশ্চিত করতে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হতো—কেউ মাদরাসায় পাঠাত, কেউ আবার পরিচিত কারও নাম বাবার জায়গায় ব্যবহার করত।
বাস্তব পরিবর্তনের গল্প
খালেদা আক্তার জানান, জন্মসনদ শিশুদের জীবনে কীভাবে বাস্তব পরিবর্তন আনে, তার উদাহরণ তিনি নিজেই দেখেছেন।
দৌলতদিয়ার এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরী জন্মনিবন্ধন পাওয়ার পর স্কুলে ভর্তি ও উপবৃত্তির সুযোগ পেয়েছে।
মেয়েটি বলেছিল, সরকার অবশেষে তার পরিচয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে। তার চোখেমুখে যে আনন্দ দেখেছি, সেটাই এই কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
উপসংহার
দৌলতদিয়ার যৌনপল্লিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্মনিবন্ধন শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি মানবিক স্বীকৃতি ও সামাজিক ন্যায়ের একটি বড় দৃষ্টান্ত। পরিচয়হীনতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে এই শিশুরা এখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হতে পারছে, যা তাদের ভবিষ্যতের পথচলাকে অনেকটাই নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় করে তুলবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
আরও পড়ুন-মৃত্যু নিবন্ধন আবেদন পত্র প্রিন্ট করার নিয়ম (আপডেট)
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










