দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাইবার হয়রানির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। গবেষণাটি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী প্রায় ৯০.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছেন।
‘সাইবার ভিক্টিমাইজেশন প্যাটার্নস অ্যামং ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস: অ্যান এক্সপ্লোরেটরি অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেসে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
আরও পড়ুন- সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ইলেকট্রিক বাস শুল্কমুক্তের ঘোষণা
গবেষণাটি পরিচালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাইমা নিগার, নুজহাত আহমদ এবং মো. রিয়াজ হোসেন। এতে মোট ২৬৭ জন শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ২২.৬১ বছর এবং নারী-পুরুষের সংখ্যা ছিল প্রায় সমান।
গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাইবার হয়রানির অভিজ্ঞতায় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যমে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা বা ‘সোশ্যাল মিডিয়া ইগনোরিং’-এর ঘটনা।
প্রায় ১৩.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত বা প্রায়ই এ ধরনের আচরণের শিকার হন। এছাড়া ১২.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত আপত্তিকর মন্তব্যের মুখোমুখি হয়েছেন এবং ১০.৫ শতাংশ পেয়েছেন অপমানজনক বা আক্রমণাত্মক বার্তা।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে ভয়ংকর কিছু অনলাইন অপরাধের তথ্য। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ভুয়া পরিচয়ে হয়রানি, পাসওয়ার্ড চুরি, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, হুমকিমূলক ফোনকল, গুজব ছড়ানো এবং অনলাইন গ্রুপ থেকে বাদ দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
এমনকি কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, তাদের ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি অনুমতি ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু অনলাইন অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গবেষকরা বলছেন, সাইবার হয়রানির কারণে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ও সামাজিক সংকোচের কারণে অনেকেই বিষয়গুলো গোপন রাখেন।
গবেষক নাইমা নিগার বলেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেন না কোন বিষয়গুলো প্রকৃত অর্থে সাইবার হয়রানির মধ্যে পড়ে। এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে সাইবার অপরাধের ধরনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে পর্যাপ্ত অনুদানের অভাব রয়েছে। ফলে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঢাবির উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং মোকাবিলায় বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ, হল এবং প্রক্টর অফিসে অভিযোগ বাক্সও স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুন্সী শামস উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের বড় দাবি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কার্যকর সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে তোলার ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।
সূত্র: ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস ও গবেষণা প্রতিবেদন
আরও পড়ুন- নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহারিক ভর্তি পরীক্ষা শুরু ১৭ মে, প্রকাশ হলো বিস্তারিত সূচি










