অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা—এই কথাটি কেবল একটি প্রবাদ নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। আমরা অনেকেই লক্ষ্য করি, যখন কাজ কম থাকে বা মন ফাঁকা থাকে, ঠিক তখনই অপ্রয়োজনীয় চিন্তা, অতীতের ব্যর্থতা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা আমাদের গ্রাস করতে শুরু করে। বাহ্যিকভাবে আমরা হয়তো কাজে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু ভেতরের মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। এর ফলে কাজের মনোযোগ নষ্ট হয়, বাড়ে মানসিক ক্লান্তি এবং ধীরে ধীরে মানুষ গুনাহের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এই অবস্থার পেছনে মূল কারণ কী? ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন—মানুষের নফস কখনো শূন্য থাকতে পারে না। তাকে ভালো কাজে ব্যস্ত না রাখলে, সে আপনাকে ভুল ও অনর্থক কাজে জড়িয়ে ফেলবেই।
আরও পড়ুন-একা নামাজে কেরাত কীভাবে পড়বেন?
নফস নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি কী বলছেন ইমাম শাফেয়ি (রহ.)
ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এ বিষয়ে একটি গভীর কথা বলেছেন। তাঁর মতে,
মানুষ যদি নিজের নফসকে হক ও নেক কাজে ব্যস্ত না রাখে, তাহলে নফস নিজেই তাকে বাতিল ও গুনাহের পথে ব্যস্ত করে দেবে।
এই কথার বাস্তবতা আমরা প্রতিদিন অনুভব করি। অবসর সময়েই বেশি গিবত হয়, অহেতুক আলোচনা হয়, মোবাইল স্ক্রলে সময় নষ্ট হয় এবং মন ধীরে ধীরে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যায়।
শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ উপায়
ইসলাম এই সমস্যার এক অত্যন্ত সহজ কিন্তু শক্তিশালী সমাধান দিয়েছে—জিকির।
জিকির মানে শুধু মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ নয়; বরং এটি হলো আল্লাহকে সচেতনভাবে স্মরণ করা, যা অন্তরকে জীবিত রাখে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি যে আমলের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন, তা হলো তাঁর স্মরণ। কারণ অন্তর যখন আল্লাহর স্মরণে ভরপুর থাকে, তখন সেখানে শয়তানের জন্য জায়গা থাকে না।
জিকির কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
১. অন্তরের প্রকৃত শান্তি
আজকের ব্যস্ত ও অস্থির জীবনে মানসিক শান্তিই সবচেয়ে বড় চাহিদা। আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে বলেছেন—আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়। দুনিয়ার কোনো বিনোদন বা সম্পদ এই শান্তি দিতে পারে না।
২. আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়
মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন আল্লাহও তাকে স্মরণ করেন। এটি বান্দা ও রবের সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে।
৩. শয়তানের বিরুদ্ধে ঢাল
ইসলামী ব্যাখ্যাকারদের মতে, আল্লাহর জিকির শুরু হলেই শয়তান সরে যায়। ফলে গিবত, পরনিন্দা ও অহেতুক কাজে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমে আসে।
৪. সহজ কিন্তু শক্তিশালী ইবাদত
জিকির এমন এক ইবাদত, যা করতে আলাদা জায়গা বা সময়ের প্রয়োজন হয় না। হাঁটতে হাঁটতে, বসে বসে, এমনকি কাজের ফাঁকেও জিকির করা যায়। অথচ এর সওয়াব অনেক বড় আমলের চেয়েও বেশি।
৫. আখিরাতের জন্য স্থায়ী বিনিয়োগ
হাদিসে এসেছে, কিছু নির্দিষ্ট জিকির জান্নাতে গাছ রোপণের কারণ হয়। অর্থাৎ দুনিয়ায় সামান্য উচ্চারণ, আখিরাতে বিশাল পুরস্কার।
আমলনামা ভারী করার সহজ জিকির
জিকিরের সৌন্দর্য হলো—এটি জিহ্বায় হালকা, কিন্তু কিয়ামতের দিন মিজানে ভারী। প্রতিদিন অল্প অল্প করে এই জিকিরগুলো পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে—
-
সুবহানাল্লাহ
-
আলহামদুলিল্লাহ
-
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
-
আস্তাগফিরুল্লাহ
-
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি
-
সুবহানাল্লাহিল আযীম
এই ছোট ছোট বাক্যগুলো মানুষের ইমানকে সতেজ রাখে।
ব্যস্ত জীবনে জিকিরের বাস্তব প্রয়োগ
অনেকে বলেন, সময় পাই না। অথচ জিকিরের জন্য আলাদা সময় বের করার প্রয়োজন নেই।
-
অফিসে যাওয়ার পথে বা ফেরার সময়।
-
রান্না বা ঘরের কাজ করার সময়।
-
ট্রাফিক জ্যামে বিরক্ত না হয়ে।
-
ঘুমানোর আগে বিছানায় শুয়ে।
এই সময়গুলোকে জিকিরে ভরে দিলে অলস মন আর শয়তানের আশ্রয়স্থল থাকে না।
শেষ কথা
হতাশা হলো শয়তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর অলস মন সেই অস্ত্রের সবচেয়ে উর্বর জমি। কিন্তু একজন মুমিন চাইলেই এই চক্র ভাঙতে পারে—আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে।
জিকির অন্তরকে শান্ত করে, গুনাহ থেকে বাঁচায় এবং আখিরাতের জন্য পাথেয় জমা করে। তাই অলস সময়কে শয়তানের হাতে তুলে না দিয়ে, আসুন জিকিরের মাধ্যমে সেই সময়কে ইবাদতে পরিণত করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব অবস্থায় তাঁর স্মরণে মশগুল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।
আরও পড়ুন-ভোটের অমোচনীয় কালি থাকলেও অজু নামাজ সহিহ হবে কি?
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










