বাংলাদেশের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা আছে—স্ত্রী নাকি স্বামীর নাম ধরে ডাকতে পারে না। কেউ বলেন এটা অসম্মান, কেউ বলেন এটা হারাম, আবার কেউ বলেন এটা সামাজিক রীতি। ফলে অনেক নারীর মনে দ্বিধা তৈরি হয়—স্বামীর নাম ধরে ডাকলে কি গুনাহ হবে? ইসলাম আসলে কী বলে?
এই প্রশ্নটি শুধু সামাজিক নয়, বরং ধর্মীয় দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুসলমান হিসেবে আমরা চাই আমাদের প্রতিটি আচরণ ইসলামের সীমার মধ্যে থাকুক। তাই আজকের এই লেখায় কোরআন, হাদিস ও আলেমদের মতামতের আলোকে সহজ ভাষায় আমরা জানবো—
👉 স্বামীর নাম ধরে ডাকা কি জায়েজ?
👉 এতে গুনাহ হয় কি?
👉 সম্মান ও শালীনতার বিষয়টি ইসলাম কীভাবে দেখে?
আরও পড়ুন-আল্লাহ যে ৫ নীরব আমল সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন
ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্কের মর্যাদা
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু সামাজিক বন্ধন নয়, এটি একটি ইবাদতের সম্পর্ক। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা, দয়া ও শান্তির বন্ধন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই সম্পর্কের ভিত্তি হলো—
-
পারস্পরিক সম্মান।
-
ভালোবাসা।
-
দায়িত্ববোধ।
-
শালীনতা।
তাই কোনো আচরণ জায়েজ না নাজায়েজ হবে—তা নির্ভর করে এই মূলনীতিগুলোর সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
স্বামীর নাম ধরে ডাকা কি ইসলাম নিষেধ করেছে?
সংক্ষেপে উত্তর হলো—
👉 ইসলামে স্বামীর নাম ধরে ডাকাকে সরাসরি হারাম বা নিষিদ্ধ বলা হয়নি।
কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই যেখানে বলা হয়েছে স্ত্রী স্বামীর নাম উচ্চারণ করতে পারবে না।
অর্থাৎ শরিয়তের দৃষ্টিতে—
✔ স্বামীর নাম ধরে ডাকা নিজেই কোনো গুনাহ নয়।
✔ এটিকে হারাম বলা যায় না।
✔ এটি মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়।
তাহলে কেন সমাজে এটি ভুল মনে করা হয়?
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের অনেক সমাজে স্ত্রী স্বামীকে নাম ধরে না ডেকে—
-
“ওই শোনো”
-
“আপনি”
-
“বাবার নাম ধরে”
-
“ছেলের বাবা”
এইভাবে সম্বোধন করেন। এটা মূলত সংস্কৃতি ও শালীনতার প্রকাশ।
অনেকে এটিকে ইসলামের অংশ ভেবে নেন, কিন্তু বাস্তবে এটি ইসলামের নয়, সমাজের রীতি।
হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসে কী পাওয়া যায়?
হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে—
-
স্ত্রী স্বামীকে নাম ধরে ডেকেছেন।
-
সাহাবি নারীরা সাহাবিদের নাম উচ্চারণ করেছেন।
-
রাসূল ﷺ-এর স্ত্রীগণ তাঁর নাম উচ্চারণ করতেন।
এতে কোথাও গুনাহ বা নিষেধের কথা বলা হয়নি।
তবে সব ক্ষেত্রেই একটি বিষয় ছিল—সম্মান ও শালীনতা বজায় রাখা।
তাহলে কোন ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে?
স্বামীর নাম ধরে ডাকা তখনই সমস্যার হতে পারে, যখন—
-
তাতে অসম্মান বা তুচ্ছতা প্রকাশ পায়।
-
রাগ, অপমান বা ব্যঙ্গের ভঙ্গি থাকে।
-
জনসম্মুখে অসম্মানজনক টোনে বলা হয়।
কারণ ইসলাম নাম নয়, বরং আচরণ ও উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দেয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক আচরণ কী?
ইসলাম চায়—
-
স্বামীকে সম্মানের সাথে সম্বোধন করা।
-
ভালোবাসা ও শালীনতা বজায় রাখা।
-
কথা বলার ভঙ্গি সুন্দর হওয়া।
-
পারস্পরিক মর্যাদা রক্ষা করা।
এই শর্তগুলো মানা হলে নাম ধরে ডাকলেও তা গুনাহ নয়।
স্ত্রী স্বামীকে কীভাবে ডাকলে উত্তম?
ইসলামী আদব অনুযায়ী উত্তম হলো—
-
সম্মানসূচক ভাষায় ডাকা।
-
ভালোবাসার টোনে কথা বলা।
-
অসম্মানসূচক শব্দ পরিহার করা।
-
জনসম্মুখে মর্যাদা রক্ষা করা।
নাম ধরে ডাকলেও যদি এই আদব বজায় থাকে, তাহলে তা দোষের নয়।
স্বামীর নাম ধরে ডাকা কি গুনাহ?
👉 না, ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি গুনাহ নয়।
গুনাহ হয় তখনই, যখন তাতে—
-
অবাধ্যতা।
-
অসম্মান।
-
অহংকার।
-
কটূক্তি থাকে। নাম উচ্চারণ নিজেই গুনাহ নয়।
তাহলে সমাজের কথা শুনব নাকি ইসলামের কথা?
সমাজের রীতি সম্মানযোগ্য, যতক্ষণ তা ইসলামের বিরোধী না হয়। কিন্তু কোনো সামাজিক রীতিকে ইসলামের বিধান ভেবে নেওয়া সঠিক নয়।
ইসলাম আমাদের শেখায়—
✔ সম্মান বজায় রাখো।
✔ সম্পর্ক সুন্দর রাখো।
✔ আচরণ শালীন রাখো।
নাম উচ্চারণ বা না করা—এটা গৌণ বিষয়।
দাম্পত্য জীবনে কেন এই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ এই ধরনের ভুল ধারণা—
-
দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে।
-
অপ্রয়োজনীয় ভয় তৈরি করে।
-
নারীদের মানসিক চাপ দেয়।
ইসলাম কখনোই সম্পর্ককে জটিল করতে চায় না, বরং সহজ ও সুন্দর করতে চায়।
প্রশ্ন ও উত্তর
স্বামীর নাম ধরে ডাকলে কি নামাজ কবুল হবে না?
না, এর সঙ্গে নামাজ কবুল হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
স্বামীর নাম উচ্চারণ করলে কি বেয়াদবি হয়?
না, যদি সম্মান বজায় থাকে।
হাদিসে কি এটি নিষেধ আছে?
না, কোনো সহিহ হাদিসে এমন নিষেধ নেই।
জনসম্মুখে নাম ধরে ডাকা কি ঠিক?
সম্মান বজায় রেখে হলে সমস্যা নেই।
স্বামী স্ত্রীকে নাম ধরে ডাকতে পারে?
হ্যাঁ, সেটিও জায়েজ।
সমাজের কথা না মানলে কি গুনাহ হবে?
না, গুনাহ হয় শুধু ইসলামের বিধান লঙ্ঘনে।
তাহলে উত্তম কী?
সম্মান, শালীনতা ও ভালোবাসা বজায় রাখা।
উপসংহার
স্বামীর নাম ধরে ডাকা ইসলামে হারাম নয়, নাজায়েজ নয়, এবং গুনাহও নয়।
ইসলাম নাম নয়, বরং আচরণ, উদ্দেশ্য ও সম্মানকে গুরুত্ব দেয়।
আপনি যদি স্বামীকে নাম ধরে ডাকেন এবং তাতে সম্মান, ভালোবাসা ও শালীনতা বজায় থাকে—তাহলে এতে কোনো গুনাহ নেই।
আরও পড়ুন-অলৌকিক ভাবে দোয়া কবুলের আমল
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔










