বর্তমান বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যক্তিগত লেনদেন কিংবা ধার–দেনার ক্ষেত্রে চেক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দলিল। কিন্তু এই চেকই অনেক সময় একজন সাধারণ মানুষকে ফেলে দিতে পারে বড় ধরনের আইনি সমস্যার মধ্যে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন আদালতে অসংখ্য চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের হচ্ছে, যার বড় একটি অংশই ঘটে অসচেতনতা, ভুল সিদ্ধান্ত অথবা আইনের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে।
চেক মামলা শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একজন মানুষের সামাজিক সম্মান, মানসিক শান্তি এবং ব্যক্তিগত জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আগে থেকেই জানা দরকার—চেক মামলা কীভাবে হয়, কোন পরিস্থিতিতে হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চেক মামলা থেকে বাঁচার উপায় কী।
এই লেখায় আমরা কোনো আতঙ্ক ছড়ানো নয়, বরং বাস্তব ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সহজ ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করবো।
আরও – অনলাইনে মামলা দেখার উপায় ২০২৬
চেক মামলা কী এবং কোন আইনে এটি হয়?
বাংলাদেশে চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলা পরিচালিত হয় Negotiable Instruments Act, 1881–এর ১৩৮ ধারার আওতায়। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি দেনা পরিশোধের উদ্দেশ্যে চেক প্রদান করেন এবং সেই চেক ব্যাংকে উপস্থাপনের পর ডিজঅনার হয়, তাহলে নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চেক গ্রহীতা মামলা করতে পারেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চেক ডিজঅনার হলেই সঙ্গে সঙ্গে মামলা হয় না। আইন অনুযায়ী কিছু ধাপ ও সময়সীমা আছে, যেগুলো অনুসরণ না করলে মামলা গ্রহণযোগ্য হয় না।
কোন কারণে চেক ডিজঅনার হয়?
চেক ডিজঅনার হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি বাস্তব কারণ থাকে। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা। এছাড়া অনেক সময় চেকের তারিখ ভুল লেখা, মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, স্বাক্ষর না মেলা কিংবা অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকা অবস্থায় চেক দেওয়া হলেও চেক ডিজঅনার হয়।
কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে “স্টপ পেমেন্ট” দেওয়ার কারণেও মামলা তৈরি হয়। এসব কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে অনেক ঝামেলাই আগে থেকে এড়ানো সম্ভব।
চেক মামলা থেকে বাঁচার উপায়
চেক মামলা থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত। নিচে বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
চেক দেওয়ার আগে অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স নিশ্চিত করা
চেক দেওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা আছে কিনা তা নিশ্চিত করা। অনেক সময় সাময়িক সমস্যার কারণে বা ভবিষ্যতে টাকা আসবে এই আশায় চেক দিয়ে দেওয়া হয়, যা পরে বড় আইনি ঝামেলায় রূপ নেয়। চেক কোনো প্রতিশ্রুতিপত্র নয়; এটি তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধযোগ্য একটি দলিল।
পোস্ট ডেটেড চেক দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
বাংলাদেশে পোস্ট ডেটেড চেক খুবই প্রচলিত। ব্যবসা বা ব্যক্তিগত লেনদেনে ভবিষ্যতের তারিখ দিয়ে চেক দেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে চেক দেওয়ার তারিখের আগেই অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, যিনি চেক নিচ্ছেন তার সঙ্গে একটি লিখিত সমঝোতা বা চুক্তি থাকলে ভবিষ্যতে নিজেকে আইনি ভাবে সুরক্ষিত রাখা সহজ হয়।
ফাঁকা চেকে কখনো স্বাক্ষর না করা
ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করা সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাসগুলোর একটি। অনেকেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে এটি করেন, কিন্তু আইনের চোখে ফাঁকা চেকও একটি পূর্ণ চেক হিসেবে বিবেচিত হয়। পরে সেই চেকে যেকোনো অংক বসিয়ে মামলা করা সম্ভব হয়। তাই নিজের নিরাপত্তার জন্য ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।
চেক দেওয়ার সময় প্রমাণ সংরক্ষণ করা
চেক দেওয়ার সময় একটি লিখিত রসিদ, চুক্তি বা সাক্ষীর উপস্থিতি থাকলে ভবিষ্যতে বড় সহায়তা পাওয়া যায়। এতে প্রমাণ করা সহজ হয় যে চেকটি কোন উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল এবং আসল দেনার পরিমাণ কত ছিল। অনেক সময় অতিরিক্ত অংক দাবি করে মামলা করা হয়, যা প্রমাণের অভাবে জটিল হয়ে ওঠে।
চেক হারিয়ে গেলে বা অপব্যবহারের আশঙ্কা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া
যদি কোনো কারণে চেক হারিয়ে যায় বা অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত ব্যাংকে লিখিতভাবে স্টপ পেমেন্ট আবেদন করতে হবে। এই আবেদনের কপি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভবিষ্যতে আইনি প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
আইনি নোটিশকে কখনো অবহেলা না করা
চেক ডিজঅনার মামলার আগে সাধারণত একটি আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। অনেকেই এই নোটিশকে গুরুত্ব দেন না, যা সবচেয়ে বড় ভুল। নোটিশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ বা আইনজীবীর মাধ্যমে উত্তর না দিলে মামলা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই মামলা এড়ানো সম্ভব।
মামলা হওয়ার আগেই সমঝোতার চেষ্টা করা
চেক মামলা থেকে বাঁচার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হলো সমঝোতা। টাকা পরিশোধ, কিস্তিতে নিষ্পত্তি বা লিখিত সমাধানের মাধ্যমে অনেক মামলা আদালতে যাওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। এতে দুই পক্ষই সময় ও অর্থের ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়।
চেক মামলা হয়ে গেলে কী করবেন?
যদি ইতোমধ্যে চেক মামলা হয়ে যায়, তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। আদালতের নোটিশ এড়িয়ে যাওয়া বা হাজিরা না দেওয়া পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। সঠিক আইনি কৌশলে অনেক ক্ষেত্রেই মামলার ফলাফল নিজের পক্ষে আনা সম্ভব।
চেক মামলায় সম্ভাব্য শাস্তি
বাংলাদেশে চেক মামলায় জরিমানা, ক্ষতিপূরণ এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবে শাস্তির ধরন মামলার পরিস্থিতি ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তাই বিষয়টি কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
প্রশ্ন–উত্তর
চেক ডিজঅনার হলেই কি সঙ্গে সঙ্গে মামলা হয়?
না। আগে আইনি নোটিশ পাঠানো হয় এবং সময় দেওয়া হয়।
নোটিশ পাওয়ার পর টাকা দিলে কি মামলা বন্ধ হবে?
অনেক ক্ষেত্রে হ্যাঁ, যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হয়।
চেক মামলা কি জামিনযোগ্য?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জামিনযোগ্য হলেও আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফাঁকা চেক দিলে কি নিজেকে বাঁচানো সম্ভব?
প্রমাণ ছাড়া বিষয়টি কঠিন হয়ে যায়, তাই শুরুতেই সতর্ক থাকা জরুরি।
উপসংহার
চেক মামলা থেকে বাঁচার উপায় মূলত নির্ভর করে সচেতনতা, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং আইনের মৌলিক জ্ঞানের ওপর। চেক একটি শক্তিশালী আইনি দলিল—এটি যেমন লেনদেন সহজ করে, তেমনি অসতর্ক হলে বড় বিপদের কারণও হতে পারে।
চেক দেওয়ার আগে চিন্তা করা, আইনি নোটিশকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে দ্রুত সমঝোতার পথে যাওয়া—এই তিনটি বিষয় মেনে চললে অধিকাংশ চেক মামলাই সহজে এড়ানো সম্ভব। সচেতন থাকাই এখানে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
আরও পড়ুন-মিথ্যা মামলা থেকে বাঁচার উপায়: বাংলাদেশে আইনি ও বাস্তব সমাধান
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔


