টাওয়ার থেকে ১৬ কিলোমিটার ক্যাবল, ২ হাজার ব্যাটারি চুরি, ঝুঁকিতে মোবাইল সেবা
মোবাইল টাওয়ার থেকে ব্যাটারি, পাওয়ার ক্যাবল ও গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম চুরির ঘটনায় বাড়ছে নেটওয়ার্ক বিভ্রাট।
মোবাইল ফোন টাওয়ার থেকে ব্যাটারি, পাওয়ার ক্যাবলসহ নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি চুরি বেড়ে যাওয়ায় দেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ২০ মাসে প্রায় ১৬ হাজার মিটার পাওয়ার ক্যাবল, ২ হাজারের বেশি ব্যাটারি এবং ৫০০-র বেশি রিমোট রেডিও ইউনিট (আরআরইউ) চুরি যাওয়ার তথ্য জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)। এসব চুরির ঘটনায় একদিকে অপারেটরদের বাড়তি খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে অ্যামটব। ১৬ সেপ্টেম্বর বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে দেওয়া এক চিঠিতে সংগঠনটি জানায়, গত আট মাসে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় টেলিকম অবকাঠামোতে চুরির ঘটনা বেড়েছে। বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, লালবাগ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার ও গাজীপুরের মতো এলাকাগুলোতে এ ধরনের ঘটনা উল্লেখযোগ্য বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
অ্যামটবের মহাসচিব লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, গত কয়েক বছরে মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো থেকে পাওয়ার ক্যাবল, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জাম চুরির ঘটনা বহুগুণ বেড়েছে। এতে অপারেটরদের পাশাপাশি গ্রাহকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
চুরি হওয়া সরঞ্জামের প্রভাব সরাসরি নেটওয়ার্কে পড়ছে। টাওয়ারের ব্যাকআপ ব্যাটারি চুরি হলে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় সাইট সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার আরআরইউ, বিটিএস কার্ডের মতো সক্রিয় নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম খুলে নিয়ে গেলে কল, মোবাইল ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাহত হতে পারে। অ্যামটবের ভাষ্য, কোনো কোনো ঘটনায় একটি টাওয়ার অচল হয়ে পুরো এলাকার বিপুলসংখ্যক গ্রাহক যোগাযোগ সমস্যায় পড়ছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত চারটি অপারেটরের হিসাবে ৭ হাজার ৯৬৪ মিটার পাওয়ার ক্যাবল, ১৯৪টি আরআরইউ, ১৭০টি বিটিএস কার্ড এবং ৭৫৬টি ব্যাটারি চুরি হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের ৭৫টি বিটিএস কার্ড, রবির ৪৮টি এবং বাংলালিংকের ২৯টি বিটিএস কার্ড চুরি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই তিন অপারেটরের ক্ষেত্রে চুরি হওয়া বিটিএস কার্ডের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৬, ১০ ও ৯টি।
পাওয়ার ক্যাবল চুরির হিসাবেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গ্রামীণফোনের ৫০৭ মিটার, রবির ৪১৭ মিটার, বাংলালিংকের ২৯১ মিটার এবং টেলিটকের ৬ হাজার ৭৪৯ মিটার ক্যাবল চুরি হয়েছে। গত ২০ মাসের হিসাবে মোট প্রায় ১৬ হাজার মিটার চুরি যাওয়া ক্যাবলের মধ্যে টেলিটকের অংশ প্রায় ১৪ হাজার মিটার। একই সময়ে চুরি হওয়া ২ হাজারের বেশি ব্যাটারির মধ্যে টেলিটকেরই প্রায় ১ হাজার ২৪৫টি।
টেলিটকের নিজস্ব টাওয়ার রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪৯০টি। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির কিছু সাইটে ভৌত নিরাপত্তাব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় সেখানে চুরির ঘটনা বেশি ঘটতে পারে। এ বিষয়ে টেলিটক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চোরদের লক্ষ্য শুধু ক্যাবল বা ব্যাটারিতে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান জানান, এখন আরআরইউ, এসএফপি মডিউল ও বিটিএস কার্ডের মতো সক্রিয় নেটওয়ার্ক সরঞ্জামও খুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এসব যন্ত্র টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের বাইরে খুব বেশি কাজে না লাগলেও চুরি হলে সংশ্লিষ্ট সাইট সচল করতে বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, পরিবহন, স্থাপন ও পুনঃকনফিগারেশনে সময় লাগে। এতে কোনো কোনো সাইট ঘণ্টার পর ঘণ্টা অচল থাকতে পারে।
অ্যামটবের হিসাবে, বিশেষায়িত এসব সরঞ্জাম স্থানীয় বাজারে সব সময় সহজে পাওয়া যায় না। ফলে চুরি হওয়া যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন করতে অপারেটরদের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকার সময়ে রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি গ্রাহকদের সেবার মান নিয়েও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, সারা দেশে ব্যাটারি, রেডিও ও ট্রান্সমিশন সরঞ্জামসহ নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা বাড়ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি গ্রাহকদের সংযোগ ও সামগ্রিক সেবা অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চুরি ঠেকাতে অপারেটরগুলো পুলিশকে নিয়মিত তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ সরবরাহ করছে বলে জানিয়েছে। তবে অ্যামটব মনে করছে, শুধু চোরদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; চুরি হওয়া যন্ত্রাংশ যারা কেনাবেচা করে, তাদেরও আইনের আওতায় এনে পুরো চোরাই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংগঠনটি জানিয়েছে, টেলিকম অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ চুরি বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ জন্য বিটিআরসির পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকেও চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: The Business Standard
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
