লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনা ফুটবলের জন্য এক আবেগঘন রাত। তবে এই রাত শুধু মেসিকে বিদায় জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, একই সঙ্গে জাতীয় দল থেকে বিদায় নিলেন দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দিও। বেনিনের বিপক্ষে মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলের জয় পায়। ম্যাচের প্রথম গোলটি করেন ওতামেন্দি, আর সেই গোলের পরপরই তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়। ফলে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি পরিণত হয় স্মরণীয় এক মুহূর্তে। মেসির কর্নার থেকে আসা বল দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে গোল করেন এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার।

ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও বেনিনের রক্ষণ ভাঙতে প্রথমার্ধে তাদের অপেক্ষা করতে হয়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আসে সেই কাঙ্ক্ষিত গোল। লিওনেল মেসির নেওয়া কর্নার থেকে ওতামেন্দি বক্সের ভেতরে সঠিক অবস্থান নিয়ে বলটি জালে পাঠান। গোলটি ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে করা শেষ গোল, যা পুরো মুহূর্তটিকে আরও বিশেষ করে তোলে। গোলের পর মেসি ও ওতামেন্দির উদযাপনও নজর কেড়ে নেয়। দুই বিশ্বকাপজয়ী তারকার একসঙ্গে উদযাপনের দৃশ্য আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য হয়ে ওঠে স্মরণীয় এক ছবি।

ওতামেন্দির জন্য ম্যাচটির আরেকটি বিশেষ দিক ছিল গোল করার মাত্র কয়েক মিনিট পরই তার মাঠ ছেড়ে যাওয়া। কোচ লিওনেল স্কালোনি তাকে বদলি করে মাঠ থেকে তুলে নেন, আর মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের দর্শকেরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। সতীর্থদের সঙ্গে আলিঙ্গন করে ওতামেন্দি শেষবারের মতো জাতীয় দলের মাঠ ছাড়েন। তার এই বিদায় ছিল পরিকল্পিত সম্মাননা, কারণ বিশ্বকাপের পরই তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন। মেসির শেষ ম্যাচে তাকে আবারও দলে ডাকা হয়েছিল মূলত এই ঐতিহাসিক রাতের অংশ হতে।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে ওতামেন্দির পথচলা ছিল দীর্ঘ ও সাফল্যে ভরা। তিনি প্রায় ১৭ বছর জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন এবং ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি দুটি কোপা আমেরিকা জয়েও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি ১৩৯টি ম্যাচ খেলেছেন এবং চারটি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে খেলাটিকেই তিনি আগে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। তবে মেসির বিদায়ী ম্যাচে বিশেষ আমন্ত্রণ পাওয়ায় আরও একবার আর্জেন্টিনার জার্সি পরার সুযোগ পান তিনি।

মেসির সঙ্গে ওতামেন্দির সম্পর্কও এই বিদায়কে আরও আবেগপূর্ণ করে তোলে। দীর্ঘ সময় ধরে দুজন একই জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন এবং আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যগুলোর অংশ ছিলেন। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং পরবর্তী সময়ের সাফল্যের পথে তারা একসঙ্গে লড়েছেন। ওতামেন্দি পরে জানান, মেসির একটি ফোনের কারণেই তিনি বেনিনের বিপক্ষে এই বিশেষ ম্যাচে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। ফলে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হিসেবে তিনি এমন একটি রাত পেলেন, যেখানে তার সতীর্থ ও অধিনায়ক মেসিও একই সঙ্গে বিদায় নিচ্ছিলেন।

ওতামেন্দির বিদায়ের পরও আর্জেন্টিনার গোলের ধারা থামেনি। নিকো পাজ দ্বিতীয় গোলটি করেন এবং এরপর আসে রাতের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। মেসি নিজেই আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোল করে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচকে আরও স্মরণীয় করে তোলেন। এর ফলে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে। মেসি একটি গোল করার পাশাপাশি দুটি গোলে অবদান রাখেন, আর ওতামেন্দির গোলটি হয়ে থাকে এই ঐতিহাসিক রাতের প্রথম অধ্যায়। আর্জেন্টিনা ফুটবলের দুই অভিজ্ঞ তারকা একই ম্যাচে বিদায় নেওয়ায় রাতটি আরও বিশেষ হয়ে ওঠে।

ওতামেন্দির জন্য তাই বেনিনের বিপক্ষে এই ম্যাচটি ছিল একেবারে নিখুঁত বিদায়ের মতো। শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল, সতীর্থদের ভালোবাসা, মনুমেন্টালের দর্শকদের দাঁড়িয়ে অভিবাদন এবং মেসির বিদায়ের সঙ্গে একই মঞ্চ ভাগ করে নেওয়া—সবকিছু মিলিয়ে তার ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ হয় স্মরণীয়ভাবে। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা জেতা এই ডিফেন্ডার শেষবারের মতো আলবিসেলেস্তে জার্সি গায়ে মাঠ ছাড়েন মাথা উঁচু করে। মেসির বিদায়ের আলোয় হয়তো রাতটির বড় অংশ জুড়ে ছিল ১০ নম্বরের আবেগ, কিন্তু ওতামেন্দির বিদায়ও আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে আলাদা একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!