রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি প্রধান রুটে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। নতুন ব্যবস্থায় একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাসের পরিবর্তে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ভিত্তিতে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস সেবা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত ৩২টি রুট এখনো চূড়ান্ত নয়। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এতে পরিবর্তন বা পরিমার্জন আসতে পারে।
ডিটিসিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি রুটে কতটি বাস চলবে, কোন কোম্পানি বাস পরিচালনা করবে, কোথায় কাউন্টার থাকবে, কোথায় ডিপো ও লে-ওভার পার্কিং হবে—এসব বিষয় নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাসের আকার, বৈশিষ্ট্য, ফিটনেস ও অন্যান্য ন্যূনতম মানদণ্ডও নির্ধারণ করা হবে। ফলে নির্ধারিত রুটে চলাচলকারী বাসগুলোকে নির্দিষ্ট মান বজায় রেখেই যাত্রীসেবা দিতে হবে।
প্রস্তাবিত ৩২টি রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, মালিক ও শ্রমিকদের কীভাবে এর সঙ্গে যুক্ত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কীভাবে গড়ে তোলা হবে—এসব বিষয় নিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাসমালিক, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করেছে ডিটিসিএ। অংশীজনদের পর্যালোচনার জন্য পরিকল্পনাটি সচিবালয়েও পাঠানো হয়েছে।
ডিটিসিএ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করা ৩২টি রুটের গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশই বিদ্যমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নতুন রুটগুলোর মাধ্যমে ঢাকা বিমানবন্দর, গাবতলী, মহাখালী, কুড়িল, গুলিস্তান, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, সদরঘাট, কাঁচপুর, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর ও কেরানীগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে নন্দনপার্ক–ডেমরা, নন্দনপার্ক–কাঁচপুর, দিয়াবাড়ী–সদরঘাট, শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির, কোনাবাড়ী–কেরানীগঞ্জ, গাবতলী–শিমুলতলী, ঘাটারচর–সালনা, নবীনগর–বাবুবাজার, সাভার–কাঁচপুর, গাবতলী–ডেমরা, গাবতলী–কুড়িল, কাঁচপুর–গাজীপুর ও সাভার–আড়াইহাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুট।
ডিটিসিএর ডেপুটি প্ল্যানার ধ্রুব আলম জানিয়েছেন, যাত্রীদের চাহিদা বিবেচনা করে প্রতিটি রুটে বাসের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। বাসগুলোকে একীভূত করা হলে স্বাভাবিকভাবেই মালিক ও বাসের সংখ্যা কিছুটা কমে আসবে। রুটের যাত্রী চাহিদার ভিত্তিতে বাসের ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট করা হবে।
প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মধ্যে যাত্রী চাহিদা, বাসের প্রাপ্যতা ও সড়কের অবস্থা বিবেচনায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে ১২ মিটার দীর্ঘ ৫২ আসনের আধুনিক বাস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। রুটগুলো হলো—রুট ২১-এ বেরাইদ–খিলগাঁও রেলগেট, রুট ১-এ টিটিপাড়া–সদরঘাট, রুট ২৭-এ কাঁচপুর–গাজীপুর চৌরাস্তা, রুট ৫-এ নন্দনপার্ক (জিরানী)–ডেমরা এবং রুট ৪-এ শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির।
এর মধ্যে বেরাইদ–খিলগাঁও রেলগেট রুটটির দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার। এ রুটে দৈনিক যাত্রী চাহিদা ১ লাখ ২০ হাজার ৮৭৮ জন। টিটিপাড়া–সদরঘাট রুটের দৈর্ঘ্য ৫৬ দশমিক ১৬ কিলোমিটার এবং দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৮৬ হাজার ৫০৯ জন।
কাঁচপুর–গাজীপুর চৌরাস্তা রুটের দৈর্ঘ্য ৪৩ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার এবং দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৮৫ হাজার ২৬৬ জন। নন্দনপার্ক (জিরানী)–ডেমরা রুটের দৈর্ঘ্য ৪১ দশমিক ৬২ কিলোমিটার এবং এ রুটে দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৬০ হাজার ৮৯০ জন। আর শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির রুটটির দৈর্ঘ্য ৫৪ দশমিক ২৭ কিলোমিটার এবং দৈনিক যাত্রী চাহিদা ৫৮ হাজার ৯১০ জন।
রুট পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাটি রাজধানীজুড়ে পরিচালিত যাত্রী ও যানবাহনভিত্তিক সমীক্ষার ওপর তৈরি করা হয়েছে। ডিটিসিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি রুটে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামা এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর যাত্রার শুরু ও গন্তব্য নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার ৫২টি স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িংও করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন রুটে কত যাত্রী চলাচল করেন এবং কোন সড়কে কী পরিমাণ বাস পরিচালনা করা সম্ভব, তা নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে।
সমীক্ষায় রাজধানীর সড়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার চিত্রও উঠে এসেছে। ঢাকার মোট প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে বাস চলাচলের উপযোগী সড়ক রয়েছে মাত্র প্রায় ২৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬৮ কিলোমিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১২ কিলোমিটার সড়ক বাস চলাচলের উপযোগী।
এ পরিকল্পনায় স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ২৫টি চক্রাকার বা সার্কুলার বাস রুট চালুর প্রস্তাবও রয়েছে। এসব রুটের মাধ্যমে মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মূল সড়কে ব্যাটারি রিকশার চলাচল কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে চক্রাকার রুট চালু করতে ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চালকদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।
ডিটিসিএর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসেই রুট নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর কোন রুটে কোন কোম্পানি বাস পরিচালনা করবে, তা নিয়ে বাসমালিক সমিতির সঙ্গে আরও আলোচনা হবে। কোন রুটে কতজন যাত্রী হতে পারে, সেই হিসাব ধরে একটি ব্যবসায়িক মডেল তৈরির কাজও চলছে।
ডিটিসিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ৩২টি রুট একেবারে চূড়ান্ত নয়। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে রুটের সংখ্যা বা কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে। ৩২টি রুটের সবগুলো একসঙ্গে চালু করা সম্ভব না হলেও যতগুলো সম্ভব, ধাপে ধাপে সেগুলো চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বাস এবং ফিটনেসবিহীন বা অনুপযোগী বাস বাদ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। ডিটিসিএর কর্মকর্তারা উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, কোনো রুটে যদি ৬০টি বাসের প্রয়োজন হয় কিন্তু বর্তমানে ১০০টি বাস চলাচল করে, তাহলে অতিরিক্ত এবং ফিটনেসবিহীন বাস বাদ দেওয়া হবে। অচল ও অনুপযোগী বাস বন্ধ রাখার বিষয়ে বাসমালিক সমিতিও নীতিগতভাবে একমত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
পরবর্তী ধাপে বাসের তালিকা যাচাই, বাসের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট কাউন্টার ঠিক করে বাস চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাসের ডিপো, কাউন্টার, সময়সূচি ও অন্যান্য পরিচালনাগত বিষয় নিয়ে পরবর্তীতে আরও আলোচনা করা হবে।
রাজধানীর দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল বাস ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে একই রুটে বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিযোগিতামূলকভাবে বাস চালানোর পরিবর্তে নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে নির্ধারিত সংখ্যক বাস পরিচালনার ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। তবে এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে চূড়ান্ত রুট নির্ধারণ, মালিক-শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তি, বাসের মান নিশ্চিত করা এবং পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!