ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন হাজারো নারী ছুটছেন নানা গন্তব্যে। কেউ অফিসে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ ব্যবসায়িক কাজে। গন্তব্য আলাদা হলেও যাত্রাপথের অস্বস্তির জায়গাগুলো অনেকেরই প্রায় একই। গণপরিবহনের ঠাসাঠাসি ভিড়, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কিংবা যৌন হয়রানির আশঙ্কা—নিত্যদিনের যাতায়াতে এসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় অনেক নারীকে।

সিএনজিতে উঠলেও সবসময় স্বস্তি মেলে না। আবার প্রচলিত রাইড-শেয়ারিংয়ের বাইকে অপরিচিত পুরুষ চালকের পেছনে বসে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার বিষয়টিও অনেক নারীর কাছে অস্বস্তিকর। নিরাপত্তার চিন্তাও থাকে সঙ্গে।

নারীদের যাতায়াপথের এমন অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন একটি ভাবনার জন্ম। নারী যাত্রীদের জন্য নারী চালকের মাধ্যমে রাইড-শেয়ারিং সেবা চালুর পরিকল্পনা করেন ফাহাদ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। সেই ভাবনা থেকেই ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি যাত্রা শুরু করে ‘মায়া রাইড’।

মূলত নারীদের জন্য তৈরি এই রাইড প্ল্যাটফর্মে নারী রাইডাররা নারী যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন। শুরুতে মাত্র চারজন নারী চালক নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও চার মাসের মধ্যে রাইডারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭০ জনে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন বর্তমানে সক্রিয়ভাবে রাইড দিচ্ছেন। পাশাপাশি প্রায় ২৫ জন নারী কারচালকও যুক্ত হয়েছেন প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে। নিয়মিত কার রাইড দেন চার থেকে পাঁচজন।

ফাহাদ চৌধুরী ডেটা মার্কেটিংয়ে প্রায় আট বছর ধরে কাজ করছেন। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন লন্ডনে। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক এবং ডেটা সায়েন্সে মাস্টার্স করেছেন। তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস লন্ডন সাউথ ব্যাংক থেকে এলএলবি পড়ছেন।

দুজনেরই বেড়ে ওঠা ঢাকায়। পড়াশোনা ও কর্মব্যস্ততার পাশাপাশি ‘মায়া রাইড’ পরিচালনা করছেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, এটি শুরু করার পেছনে বড় কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ছিল না। বরং পড়াশোনার পাশাপাশি এমন একটি কাজ করতে চেয়েছিলেন, যেখান থেকে আয় করার পাশাপাশি মানুষেরও উপকার করা যায়।

জান্নাতের নিজের দেখা অভিজ্ঞতাই মূলত ভাবনাটিকে এগিয়ে নেয়। ঢাকার রাস্তায় নারী বাইক চালকদের দেখার পাশাপাশি তিনি অনেক নারী যাত্রীকে বাইকে অস্বস্তিতে থাকতে দেখেছেন। সেখান থেকেই নারী চালকের মাধ্যমে নারী যাত্রী পরিবহনের চিন্তা আসে তাঁর মাথায়।

ফাহাদ বলেন, ‘আমি যেহেতু ডেটা মার্কেটিংয়ে আট বছর ধরে কাজ করছি, ভাবলাম একটা এক্সপেরিমেন্ট করি।’ সেই ছোট্ট পরীক্ষাই পরে ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ প্ল্যাটফর্মে রূপ নেয়।

মায়া রাইডের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ চালুর পর নারী বাইক চালকেরা নিজেরাই কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করতে শুরু করেন। প্রথমে চারজন যুক্ত হলেও ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা বাড়তে থাকে। চার মাসের মধ্যে ৩০০টির বেশি বাইক রাইড হয়েছে বলে জানায় প্ল্যাটফর্মটি।

শুধু চালকেরাই নয়, নারী যাত্রীদেরও সাড়া পেয়েছেন উদ্যোক্তারা। এমনকি শুরুতেই একজন গ্রাহক ২২ বারের বেশি মায়া রাইডের সেবা নিয়েছেন। কেউ কেউ এর চেয়েও বেশি রাইড নিয়েছেন।

এমন নিয়মিত গ্রাহকদের একজন নুঝাত তাবাসসুম। ঢাকার শ্যামলীর বাসিন্দা নুঝাত ২০২৩ সাল থেকে নিয়মিত গুলশান-১ এলাকায় অফিসে যাতায়াত করেন। নিজের গাড়ি থাকলেও সবসময় সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। বিভিন্ন সময়ে বাস, সিএনজি কিংবা প্রচলিত রাইড-শেয়ারিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাঁকে।

এক সহকর্মীর কাছ থেকে মায়া রাইডের কথা জানতে পারেন তিনি। প্রথমবারের অভিজ্ঞতা ভালো লাগার পর একাধিকবার সেবাটি নেন। এখন পর্যন্ত ৩০ বারের বেশি মায়া রাইড ব্যবহার করেছেন তিনি।

নুঝাতের কাছে সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো চালকের আসনে একজন নারী থাকা। তাঁর ভাষায়, প্রচলিত রাইড-শেয়ারিংয়ের তুলনায় মায়া রাইডের খরচ কিছুটা বেশি হলেও এখানে নিজেকে নিরাপদ ও স্বস্তিতে মনে হয়।

তবে ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন জান্নাতও। তাঁর ব্যাখ্যা, প্রয়োজনের তুলনায় এখনো পর্যাপ্তসংখ্যক নারী চালক নেই। ফলে কোনো কোনো চালককে দূর থেকে এসে যাত্রী নিতে হয়। ঢাকার বিভিন্ন অলিগলি পর্যন্ত যেতে হয় তাঁদের। এতে স্বাভাবিকভাবেই পরিচালন ব্যয় বাড়ে।

আরও বেশি নারী চালক যুক্ত করতে পারলে ভাড়া কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে এতে গ্রাহকের সংখ্যাও বাড়বে বলে তাঁদের প্রত্যাশা।

নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে চালক যুক্ত করার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মায়া রাইড। ওয়েবসাইটে আবেদন ফরম পূরণের পর জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ছবি, গাড়ি বা বাইকের নম্বর এবং যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

সম্প্রতি লাইসেন্স পাওয়া বা অল্প অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চালকদের দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয় না। অন্তত এক থেকে দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকা রাইডারদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বলে জানান ফাহাদ।

বাইক রাইডের পাশাপাশি নারী যাত্রীদের জন্য কার সার্ভিসও চালু করেছে মায়া রাইড। মূলত সাপ্তাহিক ও মাসিক সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক এই সেবায় একই গাড়িতে একজন থেকে তিন-চারজন নারী যাত্রী থাকতে পারেন। কাছাকাছি নির্দিষ্ট পিকআপ পয়েন্ট থেকে যাত্রী নেওয়া হয়।

কার সার্ভিসে দুটি প্যাকেজ রয়েছে—‘পিক আপ পয়েন্ট’ ও ‘ডোর টু ডোর’। পিক আপ পয়েন্ট প্যাকেজের মাসিক খরচ আনুমানিক ৭ হাজার ৩০০ টাকা। ডোর টু ডোর প্যাকেজের খরচ ৯ হাজার ২০০ টাকা। ঢাকা সিটির মধ্যে যেকোনো জায়গা থেকে যাত্রা করলেও এই প্যাকেজে নির্ধারিত একই খরচ প্রযোজ্য বলে জানানো হয়েছে।

মায়া রাইডের সেবাগুলো মূলত প্রি-বুকিংনির্ভর। কার সার্ভিস নিতে কয়েক দিন আগে বুকিং দিতে হয়। বাইক রাইডের ক্ষেত্রে আগের দিন রাত ১০টার মধ্যে বুকিং দিলে নির্ধারিত সময়ে রাইডার পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

বাইক রাইডের অনুরোধ রাইডারদের একটি গ্রুপে পাঠানো হয়। আগ্রহী রাইডাররা সেখানে সাড়া দেন। রাইডার পাওয়া গেলে গ্রাহককে জানানো হয় এবং দুই পক্ষের যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বর দেওয়া হয়। রাইড শেষে নগদে ভাড়া পরিশোধ করেন যাত্রী। তবে রাইডের আগেই ভাড়ার পরিমাণ জানা যায়।

মায়া রাইডের ওয়েবসাইটে থাকা ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে যাত্রার স্থান দিলে দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া দেখা যায়। ফলে গ্রাহক নিজেও আগে থেকে সম্ভাব্য খরচ হিসাব করে নিতে পারেন।

নারীদের পাশাপাশি শিশুদের যাতায়াত নিয়েও নতুন সেবা চালু করেছে মায়া রাইড। ‘মায়া কিডস’ নামের এই সেবার মাধ্যমে স্কুলগামী শিশুদের বাসা থেকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং স্কুল শেষে নিরাপদে বাসায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এই সেবাও প্রি-বুকিংভিত্তিক। প্রয়োজনে শিশুর পরিবারের একজন সদস্যও যাত্রার সময় সঙ্গে যেতে পারেন। ব্যস্ত বাবা-মায়ের সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া বা নিয়ে আসার দুশ্চিন্তা কিছুটা কমানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য বলে জানান জান্নাতুল ফেরদৌস। এখন পর্যন্ত মায়া কিডসের প্রায় সাতজন গ্রাহক রয়েছেন।

তবে এই পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। রাইডার সংকট, মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেওয়া এবং নারী চালকদের নিয়ে মানুষের কটূক্তি—এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও এগিয়েছে মায়া রাইড। অনেক নারী শুরুতে সামাজিক মন্তব্যের কারণে আগ্রহ দেখাননি। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে উৎসাহ দিয়েছেন জান্নাত।

নারী রাইডারদের কাছ থেকে আয়ের ১০ শতাংশ কমিশন নেয় মায়া রাইড। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, আরও বেশি নারীকে এই পেশায় যুক্ত করা এবং তাঁদের জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করা।

এখন পর্যন্ত ওয়েবসাইটনির্ভর ব্যবস্থায় চলছে মায়া রাইড। তবে সেবাটিকে আরও গোছানো ও নিয়মতান্ত্রিক করতে অ্যাপ তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। সেখানে যাত্রী ও রাইডারদের আলাদা রেকর্ড, রাইডের তথ্যসহ পুরো ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আগামী তিন মাসের মধ্যে অ্যাপ চালুর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান ফাহাদ।

জান্নাতের মতে, মায়া রাইড শুধু নারী যাত্রীদের স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করছে না, বরং নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পথও তৈরি করছে। বিশেষ করে বাইক বা গাড়ি থাকা নারীরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।

ফাহাদের কাছে উদ্যোগটির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—অনেক নারী শুধু নিজের আয়ের জন্য নয়, অন্য নারীদের সহায়তা করার মানসিকতা থেকেও এই কাজে যুক্ত হচ্ছেন। নারীর জন্য নারীর তৈরি এমন একটি যাতায়াতব্যবস্থা ঢাকার ব্যস্ত শহরে নিরাপত্তা ও স্বস্তির নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি করছে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!