নতুন গাড়ি কেনার পর সেটি রাস্তায় চালানোর আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়। তবে অনেকেই গাড়ি কেনার পর রেজিস্ট্রেশনের সময় কোন কোন কাগজপত্র জমা দিতে হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। প্রয়োজনীয় নথি আগে থেকে প্রস্তুত না থাকলে আবেদন প্রক্রিয়ায় দেরিও হতে পারে।
বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী, নতুন মোটরযান নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত আবেদনপত্রের সঙ্গে মালিকানা, পরিচয়, ঠিকানা, গাড়ি কেনার প্রমাণ এবং আমদানি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। গাড়িটি ব্যক্তিগত ব্যবহারের নাকি কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে, দেশীয়ভাবে কেনা নাকি আমদানি করা—এসব বিষয়ের ওপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
ব্যক্তিগত মালিকানাধীন গাড়ির ক্ষেত্রে প্রথমেই মালিকের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের সত্যায়িত কপি প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে টেলিফোন বা বিদ্যুৎ বিলের মতো ইউটিলিটি বিলের সত্যায়িত কপিও চাওয়া হয়। ফলে গাড়ি নিবন্ধনের আবেদন করার আগে নিজের পরিচয় ও ঠিকানার প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন গাড়ির নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত আবেদন ফরমও প্রয়োজন। বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ফরমে গাড়ির মালিক ও গাড়ির বিস্তারিত তথ্য দিয়ে আবেদন করতে হয়। আবেদনপত্রে গাড়ির ইঞ্জিন নম্বর, চেসিস নম্বর, উৎপাদনের বছরসহ বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ থাকে। এসব তথ্য গাড়ির অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে মিল থাকতে হবে।
আমদানিকৃত গাড়ির ক্ষেত্রে কাগজপত্রের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। এ ধরনের গাড়ির জন্য বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস, বিল অব লেডিং এবং এলসিএর কপি প্রয়োজন হতে পারে। গাড়িটি আমদানিকারক বা বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা হলে সেল সার্টিফিকেট, সেল ইন্টিমেশন বা বিক্রয়ের প্রমাণপত্রও জমা দিতে হয়।
কিছু ক্ষেত্রে প্যাকিং লিস্ট, ডেলিভারি চালান ও গেট পাসের মতো নথিও প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে সিকেডি বা নির্দিষ্ট ধরনের আমদানিকৃত মোটরযানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র এবং অনুমোদনের বিষয় থাকতে পারে। তাই শুধু গাড়ির ক্রয় রসিদ থাকলেই সব ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
করসংক্রান্ত কাগজপত্রও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে টিআইএন বা ই-টিআইএন এবং আয়কর প্রদানের প্রমাণপত্র জমা দিতে হতে পারে। একইভাবে ভ্যাট প্রযোজ্য হলে সংশ্লিষ্ট ভ্যাটের কাগজপত্র ও পরিশোধের চালান প্রয়োজন হতে পারে। গাড়ির ধরন এবং আমদানির ধরন অনুযায়ী এসব নথির প্রয়োজনীয়তা পরিবর্তিত হতে পারে।
গাড়িটি কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নামে নিবন্ধন করতে চাইলে ব্যক্তিগত মালিকানার মতো শুধু জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি দিলেই হবে না। প্রতিষ্ঠানের লেটারহেডে প্রয়োজনীয় চিঠি বা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দিতে হতে পারে। আবার গাড়ি কেনার অর্থায়নে ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও নির্দিষ্ট কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
বিদেশি নাগরিকের নামে গাড়ি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কাজ করার অনুমতি এবং ভিসার মেয়াদের কপি জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
গাড়ির ধরন অনুযায়ী আরও কিছু বিশেষ কাগজ লাগতে পারে। যেমন বাস, ট্রাক, হিউম্যান হলার, ডেলিভারি ভ্যান বা অটোটেম্পোর মতো মোটরযানের ক্ষেত্রে অনুমোদিত বডি ও আসন ব্যবস্থার স্পেসিফিকেশনসংবলিত ড্রইং প্রয়োজন হতে পারে। সিকেডি মোটরযানের ক্ষেত্রে বিআরটিএর টাইপ অনুমোদন এবং অনুমোদিত সংযোজনী তালিকার মতো নথিও প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে বিক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র ঠিকঠাক আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ির কাগজে থাকা মালিকের নাম, গাড়ির মডেল, ইঞ্জিন নম্বর, চেসিস নম্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কোনো তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে আবেদন যাচাইয়ের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর বিআরটিএ সংশ্লিষ্ট অফিস আবেদন ও নথি যাচাই করে। কাগজপত্র সঠিক পাওয়া গেলে নিবন্ধন ফি জমা দেওয়ার জন্য অ্যাসেসমেন্ট স্লিপ দেওয়া হয়। এরপর নির্ধারিত ফি ও কর পরিশোধ করতে হয়। ফি পরিশোধের পর গাড়িটি বিআরটিএ অফিসে পরিদর্শনের জন্য হাজির করতে হয়।
গাড়ি পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গাড়ির বিভিন্ন তথ্য ও প্রয়োজনীয় বিষয় পরীক্ষা করেন। আবেদনের তথ্য, মালিকানার কাগজ এবং গাড়ির বাস্তব তথ্যের মধ্যে মিল থাকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পরিদর্শন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নিবন্ধনের পরবর্তী ধাপে যাওয়া যায়।
নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের মোট খরচও সবার জন্য এক নয়। গাড়ির ধরন, সিসি, আসন সংখ্যা, ওজন, উৎপাদন বছরসহ বিভিন্ন তথ্যের ওপর নিবন্ধন ফি, রোড ট্যাক্স ও অন্যান্য প্রযোজ্য ফি নির্ভর করে। বিআরটিএর অনলাইন ফি ক্যালকুলেটরে এসব তথ্য ব্যবহার করে নতুন মোটরযানের নিবন্ধন-সংক্রান্ত ফি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যায়।
তাই নতুন গাড়ি কেনার পর রেজিস্ট্রেশনের আবেদন করার আগে সব কাগজপত্র একবার ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্র, ঠিকানার প্রমাণ, নির্ধারিত আবেদনপত্র, বিক্রয়সংক্রান্ত কাগজ, ইনভয়েস, আমদানি নথি এবং করসংক্রান্ত কাগজে কোনো ভুল বা অসঙ্গতি আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া উচিত। এতে আবেদন জমা দেওয়ার পর অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি ও সময়ক্ষেপণ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!