কোরআনের ১১২ নম্বর সূরা সূরা ইখলাস আয়তনে ছোট হলেও এর বিষয়বস্তু অত্যন্ত গভীর। মাত্র চারটি আয়াতে আল্লাহ তাআলার একত্ব, অমুখাপেক্ষিতা এবং তাঁর অতুলনীয় সত্তার পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে মুসলমানদের মধ্যে সূরা ইখলাস নিয়মিত তিলাওয়াতের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, এই ছোট সূরাটি বারবার পড়ার বিশেষ মর্যাদা কী এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সূরা সম্পর্কে কী বলেছেন?

সহিহ হাদিসে সূরা ইখলাসের একটি বিশেষ মর্যাদা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাতে বারবার সূরা ইখলাস পড়ছিলেন। বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানানো হলে তিনি বলেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে তাঁর প্রাণ, এই সূরা কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য। সহিহ বুখারির ৫০১৩ নম্বর হাদিসে এ বর্ণনা রয়েছে।

আরেক বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের প্রশ্ন করেছিলেন, তাদের কেউ কি এক রাতে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ পড়তে সক্ষম? সাহাবিরা বিষয়টিকে কঠিন মনে করলে নবীজি (সা.) তাদের জানান, সূরা ইখলাস কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য। সহিহ বুখারির ৫০১৫ নম্বর হাদিসেও এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।

তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে বোঝা দরকার। সূরা ইখলাস কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য—এর অর্থ এই নয় যে শুধু সূরা ইখলাস পড়লেই পুরো কোরআন পড়ার ফরজ বা অন্যান্য তিলাওয়াতের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে। আলেমরা হাদিসটির ব্যাখ্যায় কোরআনের বিষয়বস্তুর দিকটি উল্লেখ করেছেন। কোরআনের বিষয়বস্তুর মধ্যে তাওহিদ, বিধান, কাহিনি ও শিক্ষা—বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। সূরা ইখলাস মূলত আল্লাহর একত্ব ও তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী ঘোষণা। তাই এর মর্যাদা এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য বলা হয়েছে।

সূরা ইখলাসের শুরুতেই বলা হয়েছে, “قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ”। বাংলা উচ্চারণ, “কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ।” অর্থ, “বলুন, তিনি আল্লাহ, এক।” এই আয়াত ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস তাওহিদের কথা ঘোষণা করে। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং ইবাদতের একমাত্র অধিকারী তিনিই—সূরাটির প্রথম আয়াতেই এই বিশ্বাস অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, “اللَّهُ الصَّمَدُ”। বাংলা উচ্চারণ, “আল্লাহুস সামাদ।” এর অর্থ, “আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।” অর্থাৎ আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন; বরং সব সৃষ্টি তাদের প্রয়োজন পূরণের জন্য তাঁর মুখাপেক্ষী। মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, অভাব-অনটন কিংবা বিপদের সময় এই বিশ্বাস একজন মুমিনকে আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে শেখায়।

তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, “لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ”। বাংলা উচ্চারণ, “লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ।” অর্থ, “তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি।” এর মাধ্যমে আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট আকিদা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি সৃষ্টির মতো নন এবং তাঁর অস্তিত্ব কোনো সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল নয়।

চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে, “وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ”। বাংলা উচ্চারণ, “ওয়ালাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।” অর্থ, “আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” সূরাটির শেষ আয়াত আল্লাহর অতুলনীয় সত্তাকে স্পষ্ট করে। অর্থাৎ কোনো সৃষ্টি, শক্তি বা সত্তা আল্লাহর সমকক্ষ নয়।

পুরো সূরাটি একসঙ্গে পড়লে এর আরবি হলো: “قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ، اللَّهُ الصَّمَدُ، لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ، وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ।”

বাংলা উচ্চারণ: “কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুস সামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ। ওয়ালাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।”

বাংলা অর্থ: “বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।”

সূরা ইখলাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা হলো, এটি আল্লাহর গুণাবলির প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে সম্পর্কিত। সহিহ বুখারির ৭৩৭৫ নম্বর হাদিসে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, একজন সাহাবি নামাজে অন্য সূরার পর নিয়মিত সূরা ইখলাস পড়তেন। তার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই সূরায় পরম দয়াময়ের গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে এবং তিনি এটি ভালোবাসেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তাকে জানিয়ে দাও যে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সূরা ইখলাস শুধু বেশি বেশি পড়ার বিষয় নয়; বরং এর অর্থ ও বিষয়বস্তুর প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে চিন্তা করাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলমান যখন বুঝে সূরাটি পড়েন, তখন তাঁর তিলাওয়াতের সঙ্গে আল্লাহর একত্বের প্রতি বিশ্বাসও আরও গভীর হতে পারে।

সকাল ও সন্ধ্যার আমলের ক্ষেত্রেও সূরা ইখলাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একটি হাসান-সহিহ হিসেবে উদ্ধৃত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়তে বলেছেন এবং এগুলো যথেষ্ট হবে বলে বর্ণিত হয়েছে। রিয়াদুস সালিহিনে আবু দাউদ ও তিরমিজির সূত্রে এ হাদিসটি উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই কেউ যদি প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস তিনবার করে পড়ার অভ্যাস করেন, তাহলে তা সুন্নাহভিত্তিক আমলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যার জিকিরের অংশ হিসেবে এগুলো পড়ার প্রচলন রয়েছে। এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কোনো নির্দিষ্ট আমলের ফজিলত বর্ণনা করার ক্ষেত্রে সহিহ বা গ্রহণযোগ্য দলিলের ওপর নির্ভর করা জরুরি।

অনেকে সূরা ইখলাস বারবার পড়ার সঙ্গে নানা ধরনের নির্দিষ্ট দুনিয়াবি ফলাফল, রোগমুক্তি বা বিশেষ সমস্যা সমাধানের নিশ্চয়তা যুক্ত করে থাকেন। কিন্তু কোনো আমলের ব্যাপারে এমন নির্দিষ্ট দাবি করার আগে নির্ভরযোগ্য দলিল থাকা প্রয়োজন। প্রমাণিত মর্যাদা হলো—সূরা ইখলাস কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য এবং এ সূরার প্রতি ভালোবাসার কারণে একজন সাহাবিকে আল্লাহর ভালোবাসার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

সূরা ইখলাস পড়ার সময় তাই শুধু কতবার পড়লাম, সেটিই মূল বিষয় হওয়া উচিত নয়। বরং প্রতিটি আয়াতের অর্থ বোঝা এবং আল্লাহর একত্বের প্রতি বিশ্বাসকে অন্তরে দৃঢ় করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। “আল্লাহ এক”, “আল্লাহ অমুখাপেক্ষী”, “তাঁর কোনো সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন”, “তাঁর সমতুল্য কেউ নেই”—এই চারটি ঘোষণা একজন মুসলমানের ঈমানি বিশ্বাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াতের জন্য বেশি সময় বের করতে না পারলেও সূরা ইখলাস সহজেই নিয়মিত পড়া যায়। নামাজে সূরাটি পড়া যায়, সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন আমলের অংশ হিসেবে পড়া যায় এবং ব্যক্তিগত তিলাওয়াতের সময়ও পড়া যায়। তবে সূরা ইখলাসের ছোট আকার দেখে এটিকে কোরআনের অন্য অংশের বিকল্প হিসেবে না দেখে কোরআনের একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সূরা হিসেবে ভালোবাসার সঙ্গে তিলাওয়াত করা উচিত।

সবশেষে বলা যায়, সূরা ইখলাস ছোট হলেও এর বার্তা অত্যন্ত গভীর। মাত্র চারটি আয়াতে আল্লাহর একত্ব ও অদ্বিতীয়তার ঘোষণা রয়েছে। সহিহ হাদিসে এর মর্যাদা কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে এবং এর প্রতি ভালোবাসার কারণে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার সুসংবাদও এসেছে। তাই সূরা ইখলাস শুধু বারবার পড়াই নয়, এর অর্থ বোঝা, তাওহিদের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা এবং সেই বিশ্বাস অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই হতে পারে একজন মুসলমানের জন্য এর প্রকৃত শিক্ষা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!