স্মার্ট টিভি এখন শুধু অনুষ্ঠান দেখার যন্ত্র নয়। ইন্টারনেট, স্ট্রিমিং, গেমিং, ভয়েস কন্ট্রোল, স্মার্ট হোম এবং বিভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় ফিচারের কারণে আধুনিক টিভি অনেকটা ছোট কম্পিউটারের মতো কাজ করে। কিন্তু টিভির উন্নত ফিচার যত বাড়ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এর পাওয়ার ও এনার্জি সেটিংস। কারণ কিছু সেটিংস স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার কিছু ফিচার টিভি নিষ্ক্রিয় থাকা অবস্থাতেও নির্দিষ্ট মাত্রায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। ফলে অজান্তেই বাড়তে পারে বিদ্যুৎ খরচ। তবে কোন সেটিংস কতটা খরচ বাড়াবে, তা টিভির মডেল, স্ক্রিনের আকার, ব্যবহার এবং ফিচারের ওপর নির্ভর করে।

সবচেয়ে আগে নজর দিতে হবে স্ক্রিনের Brightness বা উজ্জ্বলতার সেটিংসে। টিভির স্ক্রিন যত বেশি উজ্জ্বল রাখা হয়, সাধারণভাবে ব্যাকলাইট বা ডিসপ্লে সিস্টেমকে তত বেশি শক্তি ব্যবহার করতে হতে পারে। বিশেষ করে Vivid, Dynamic বা অত্যন্ত উজ্জ্বল কোনো Picture Mode ব্যবহার করলে টিভির উজ্জ্বলতা ও কনট্রাস্ট বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের Department of Energy জানিয়েছে, বিভিন্ন Picture Mode টিভির brightness ও contrast পরিবর্তন করে এবং ডিফল্ট বা ENERGY STAR-ভিত্তিক সেটিং সাধারণত বেশি দক্ষ ব্যবহারের জন্য উপযোগী।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Adaptive বা Automatic Brightness। এই ফিচারটি আসলে সবসময় বিদ্যুৎ বাড়ায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়েও সাহায্য করতে পারে। ঘরের আলো কম থাকলে টিভির স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেওয়া এবং আলো বেশি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো এর কাজ। Department of Energy-এর তথ্য অনুযায়ী, Automatic Brightness Control প্রয়োজন অনুযায়ী উজ্জ্বলতা সামঞ্জস্য করে এবং এতে শক্তি সাশ্রয়ের সুযোগ থাকে। Samsung-এর সাম্প্রতিক টিভিগুলোতেও AI Energy Mode পরিবেশের আলো, ব্যবহারের ধরন এবং কনটেন্ট বিশ্লেষণ করে উজ্জ্বলতা সামঞ্জস্য করতে পারে।

তৃতীয় বিষয় হলো AI Energy Mode বা Energy Saving Mode। নাম শুনেই অনেকে এটি বন্ধ করে রাখেন, কারণ তারা মনে করেন এতে ছবির উজ্জ্বলতা বা মান কমে যেতে পারে। কিন্তু যারা বিদ্যুৎ খরচ কমাতে চান, তাদের জন্য এই ফিচারটি বেশ কার্যকর হতে পারে। Samsung-এর বর্তমান টিভিগুলোতে AI Energy Mode আশপাশের আলোর মাত্রা শনাক্ত করে এবং কনটেন্ট অনুযায়ী স্ক্রিনের brightness সামঞ্জস্য করে শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করে। তবে সাশ্রয়ের পরিমাণ সব মডেল, স্ক্রিনের আকার, কনটেন্ট ও পরিবেশে একই হবে না।

চতুর্থ বিষয় হলো Ambient Display বা Screen Saver ধরনের ফিচার। কিছু স্মার্ট টিভিতে টিভি নিষ্ক্রিয় থাকলেও ছবি, ঘড়ি, আর্টওয়ার্ক বা অন্যান্য তথ্য দেখানোর ব্যবস্থা থাকে। এটি দেখতে আকর্ষণীয় হলেও স্ক্রিন পুরোপুরি বন্ধ না থাকায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। তাই আপনি যদি টিভি নিষ্ক্রিয় থাকা অবস্থায় কোনো ছবি বা তথ্য প্রদর্শনের প্রয়োজন না মনে করেন, তাহলে এই ধরনের ফিচার বন্ধ রাখা বা Screen Saver-এর সময় কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে এখানে মনে রাখা দরকার, Screen Saver এবং Standby Mode এক বিষয় নয় এবং বিদ্যুৎ খরচ টিভির মডেলভেদে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা হতে পারে।

পঞ্চম বিষয় হলো Quick Start বা Networked Standby। রিমোট চাপার পর টিভি যেন দ্রুত চালু হয়, কিংবা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে টিভিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—এ ধরনের সুবিধার জন্য কিছু স্মার্ট টিভি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় না থেকে Standby অবস্থায় নেটওয়ার্ক সংযোগ ধরে রাখতে পারে। Department of Energy-এর গবেষণা অনুযায়ী, Passive Standby সাধারণত খুব কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, কিন্তু Active বা Networked Standby কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি শক্তি ব্যবহার করতে পারে। কিছু Quick Start সিস্টেমে ১০ ওয়াটের বেশি Standby Power ব্যবহারের উদাহরণও গবেষণায় পাওয়া গেছে।

তবে এ কারণে রিমোট দিয়ে টিভি বন্ধ করলেই বিপুল বিদ্যুৎ বিল আসবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। অনেক আধুনিক টিভির Standby Power খুবই কম। Department of Energy-এর FEMP নির্দেশনা অনুযায়ী, ENERGY STAR-সনদপ্রাপ্ত টিভিগুলো Low Standby Power-এর ১ ওয়াট সীমা পূরণ করে বলে ধরে নেওয়া যায়। তাই বিদ্যুৎ বিলের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে কি না বুঝতে হলে শুধু Standby নয়, টিভি কতক্ষণ চালানো হচ্ছে এবং সক্রিয় অবস্থায় কত শক্তি ব্যবহার করছে সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

ষষ্ঠ বিষয় হলো Auto Power Saving বা Auto Power Off। এটি বরং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য চালু রাখা ভালো। যেমন আপনি টিভি চালু রেখে অন্য কাজে চলে গেলেন বা ঘুমিয়ে পড়লেন—নির্দিষ্ট সময় কোনো কার্যক্রম না থাকলে Auto Power Off টিভি বন্ধ করে দিতে পারে। Samsung-এর বর্তমান Energy Saving সেটিংসে Auto Power Saving ও Auto Power Off-এর মতো ফিচার রয়েছে, যেগুলো নিষ্ক্রিয় অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় শক্তি ব্যবহার কমাতে সাহায্য করতে পারে।

সপ্তম বিষয় হলো Motion Lighting বা অনুরূপ স্বয়ংক্রিয় উজ্জ্বলতা নিয়ন্ত্রণ। কিছু টিভিতে স্ক্রিনে কী ধরনের দৃশ্য চলছে তার ওপর ভিত্তি করে brightness সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা থাকে। Samsung-এর Energy Saving ফিচারে Motion Lighting এমন একটি অপশন, যা পর্দার গতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে উজ্জ্বলতা পরিবর্তন করতে পারে। ফলে কম গতির দৃশ্যে অতিরিক্ত উজ্জ্বলতা কমিয়ে শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ কমানোর সুযোগ থাকে। তবে কোন ফিচার কীভাবে কাজ করবে তা ব্র্যান্ড ও মডেল অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

LG-এর স্মার্ট টিভিতেও একই ধরনের Energy Saving ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের বর্তমান webOS টিভিতে Energy Saving Step-এর Auto অপশন পরিবেশের আলো শনাক্ত করে স্ক্রিনের brightness সামঞ্জস্য করতে পারে। পাশাপাশি Minimum Brightness এবং Auto Power Off-এর মতো সেটিংসও নির্দিষ্ট মডেলে পাওয়া যায়। অর্থাৎ ব্র্যান্ড আলাদা হলেও আধুনিক স্মার্ট টিভিগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য একই ধরনের ধারণা ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব টিভিতে একই সেটিংস বা একই নামে ফিচার থাকে না। Samsung-এ AI Energy Mode বা Energy Saving Solution থাকতে পারে, LG-তে Energy Saving Step থাকতে পারে, আবার Google TV বা অন্য প্ল্যাটফর্মে অপশনগুলোর নাম সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। এমনকি একই ব্র্যান্ডের দুটি মডেলেও সেটিংসের অবস্থান ও কার্যকারিতায় পার্থক্য থাকতে পারে। তাই নিজের টিভির User Manual বা Settings মেনু দেখে ফিচারগুলোর কাজ নিশ্চিত করা উচিত।

বিদ্যুৎ বিল কমাতে সবচেয়ে সহজ পদক্ষেপ হলো টিভির Picture Mode অযথা Vivid বা অত্যন্ত উজ্জ্বল অবস্থায় না রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী Energy Saving বা AI Energy Mode ব্যবহার করা এবং Auto Power Off চালু রাখা। পাশাপাশি Ambient Display বা Quick Start-এর মতো ফিচার প্রয়োজন না হলে বন্ধ করার কথা বিবেচনা করা যায়। তবে গেমিং বা বিশেষ কনটেন্টের ক্ষেত্রে কিছু Energy Saving ফিচার বন্ধ থাকতেই পারে। যেমন Samsung জানিয়েছে, তাদের AI Energy Mode Game Mode-এ কাজ করে না।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, টিভির বিদ্যুৎ খরচ শুধু একটি সেটিংসের ওপর নির্ভর করে না। স্ক্রিনের আকার, ডিসপ্লে প্রযুক্তি, brightness, ব্যবহারের সময়, Picture Mode, Standby ফিচার এবং টিভির নিজস্ব efficiency—সবকিছু মিলেই মোট খরচ নির্ধারিত হয়। তাই অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং টিভির Settings মেনুতে গিয়ে Power and Energy Saving, Brightness, Picture Mode, Ambient Display, Quick Start এবং Auto Power Off অপশনগুলো একবার পরীক্ষা করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে, পাশাপাশি টিভিও আরও দক্ষভাবে ব্যবহার করা যাবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!