মানুষের শরীর যেমন খাবার ও পানির মাধ্যমে শক্তি পায়, তেমনি একজন মুমিনের অন্তরেরও এমন কিছু আমল প্রয়োজন, যা তাকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত রাখে। জীবনের ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা, অর্থের চিন্তা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে মানুষের মন অনেক সময় অস্থির হয়ে পড়ে। বাহ্যিকভাবে সবকিছু ঠিক থাকলেও অন্তরে এক ধরনের শূন্যতা অনুভূত হতে পারে। ইসলামে এই অন্তরের প্রশান্তি ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো জিকির বা আল্লাহর স্মরণ।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” সূরা আর-রাদের ২৮ নম্বর আয়াতে এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তির সঙ্গে আল্লাহর স্মরণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

জিকির বলতে শুধু নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বারবার উচ্চারণ করাকেই বোঝায় না। আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর প্রশংসা করা, তাঁর একত্বের কথা মনে রাখা, তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া, দোয়া করা এবং জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আল্লাহর কথা মনে রাখাও জিকিরের বিস্তৃত অর্থের অন্তর্ভুক্ত। একজন মুসলমান যখন সচেতনভাবে আল্লাহকে স্মরণ করেন, তখন তার মনে এই উপলব্ধি তৈরি হয় যে তিনি একা নন; তার রব তার অবস্থা জানেন, তার কথা শোনেন এবং তার প্রতি তিনি মুখাপেক্ষী।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিকিরের গুরুত্ব বোঝাতে অত্যন্ত গভীর একটি উদাহরণ দিয়েছেন। সহিহ বুখারির ৬৪০৭ নম্বর হাদিসে আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে না, তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মতো।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর স্মরণ একজন মুমিনের অন্তরের জীবন্ততার সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত। মানুষের শরীর জীবিত থাকলেও যদি তার অন্তর আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকে, তাহলে সে আত্মিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিপরীতে, একজন মানুষ দুনিয়ার নানা ব্যস্ততার মধ্যেও যদি তার রবকে স্মরণ করে, তাহলে তার অন্তরে ঈমানের সচেতনতা জাগ্রত থাকে।

আল্লাহর জিকিরের একটি সহজ মাধ্যম হলো তাসবিহ পাঠ করা। “সুবহানাল্লাহ” অর্থ আল্লাহ পবিত্র ও সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত। “আলহামদুলিল্লাহ” অর্থ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। “আল্লাহু আকবার” অর্থ আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। আর “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। এসব জিকির একজন মুসলমানের জন্য সহজ এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সময়ে করা যায়।

ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াও অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। প্রতিদিনের জীবনে জেনে বা না জেনে অনেক ভুল হতে পারে। তাই “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসার চেষ্টা করে।

নামাজের সঙ্গেও জিকিরের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একজন মুসলমান দিনে পাঁচবার নামাজের মাধ্যমে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান। নামাজের ভেতরে কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, তাকবির ও দোয়া রয়েছে। নামাজ শেষে জিকির করাও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। সহিহ মুসলিমে নামাজের পর ৩৩ বার “সুবহানাল্লাহ”, ৩৩ বার “আলহামদুলিল্লাহ” এবং ৩৪ বার “আল্লাহু আকবার” পাঠ করার বর্ণনা রয়েছে।

তবে জিকির শুধু নামাজের পরেই করতে হবে—এমন নয়। একজন মুসলমান কাজের ফাঁকে, হাঁটার সময়, যাতায়াতের সময় কিংবা অবসর মুহূর্তেও আল্লাহকে স্মরণ করতে পারেন। অবশ্য জিকিরের সঙ্গে অন্যের অধিকার নষ্ট করা, ফরজ দায়িত্ব অবহেলা করা কিংবা কাজের ক্ষতি করা ইসলামি শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। বরং একজন মুমিন তার দৈনন্দিন জীবনকে এমনভাবে সাজাবেন, যাতে দুনিয়াবি দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তার অন্তর আল্লাহর স্মরণে থাকে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণকারীদের বিশেষ মর্যাদার কথাও বলেছেন। সহিহ মুসলিমের ২৬৭৬ নম্বর হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) “মুফাররিদুন” বা অগ্রগামীদের কথা উল্লেখ করলে সাহাবিরা জানতে চান তারা কারা। তিনি বলেন, তারা সেই পুরুষ ও নারী, যারা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে।

জিকিরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি মানুষকে নিজের অবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। একজন মানুষ যখন “আলহামদুলিল্লাহ” বলেন, তখন তিনি আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করেন। “আস্তাগফিরুল্লাহ” বললে নিজের ভুল ও দুর্বলতার কথা মনে পড়ে। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বললে তাওহিদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়। এভাবে জিকির শুধু জিহ্বার উচ্চারণে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের চিন্তা ও চরিত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

আল্লাহর স্মরণে অন্তর প্রশান্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে একজন মুমিনের জীবনে আর কোনো দুঃখ, সমস্যা বা পরীক্ষা থাকবে না। বরং সমস্যার মধ্যেও সে আল্লাহর ওপর ভরসা করার শক্তি পেতে পারে। দুশ্চিন্তার সময় আল্লাহকে স্মরণ করলে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে এবং সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেই—এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে শেখে। ফলে বিপদের সময় হতাশ হয়ে পড়ার পরিবর্তে সে দোয়া, চেষ্টা ও ধৈর্যের পথ বেছে নিতে পারে।

জিকিরের সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াতেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোরআন আল্লাহর বাণী এবং তা মানুষের জন্য হেদায়াতের উৎস। প্রতিদিন অল্প হলেও কোরআন পড়া এবং তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করলে একজন মুসলমানের আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। শুধু দ্রুত তিলাওয়াত করার পরিবর্তে আয়াতের অর্থ ও শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করলে তা দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করার সুযোগও বাড়ে।

একজন মুসলমান চাইলে দিনের জন্য খুব সহজ একটি জিকিরের অভ্যাস তৈরি করতে পারেন। ঘুম থেকে ওঠার পর আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে দিন শুরু করা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা, নামাজের পর মাসনুন জিকির করা, কাজের ফাঁকে ইস্তিগফার ও তাসবিহ পাঠ করা এবং রাতে ঘুমানোর আগে কিছু সময় আল্লাহকে স্মরণ করা—এভাবে ধীরে ধীরে জিকির জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসে আল্লাহর জিকিরের সঙ্গে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার স্মরণের সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, বান্দা যখন আল্লাহকে স্মরণ করে, আল্লাহও তাকে স্মরণ করেন। এটি একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক শিক্ষা। অর্থাৎ বান্দা আল্লাহর দিকে ফিরে গেলে সে আল্লাহর রহমত ও নৈকট্যের আশা করতে পারে।

তাই মানুষের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে জীবন্ত রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নিয়মিত জিকির। তবে জিকিরের সঙ্গে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, ইস্তিগফার এবং সৎকর্মের সম্পর্কও গভীর। শুধু মুখে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়; জীবনের আচরণেও আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করার চেষ্টা করতে হবে। কারণ সত্যিকারের আল্লাহভীতি মানুষের কথা, কাজ, চরিত্র ও সিদ্ধান্তে প্রকাশ পাওয়া উচিত।

ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বের করা সম্ভব না হলেও কয়েক মিনিট দিয়ে এই অভ্যাস শুরু করা যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর প্রশংসা, নামাজের পর জিকির, দিনের বিভিন্ন সময়ে ইস্তিগফার এবং রাতে নিজের আমল পর্যালোচনা—এই ছোট ছোট অভ্যাস একজন মুসলমানকে আল্লাহর স্মরণে থাকতে সাহায্য করতে পারে। কোরআনের ভাষায়, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়। তাই অন্তরকে জীবন্ত ও প্রশান্ত রাখতে একজন মুসলমানের জীবনে জিকিরকে নিয়মিত আমল হিসেবে স্থান দেওয়া অত্যন্ত মূল্যবান।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!