হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই বিমানকর্মীর জুতার ভেতর বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ৮০টি স্বর্ণবার উদ্ধার করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের মোট ওজন প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। কাস্টমস কর্মকর্তাদের হিসাবে এর আনুমানিক বাজারমূল্য ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে দুবাই থেকে আসা এমিরেটস এয়ারলাইন্সের EK582 ফ্লাইটের দুই বিমানকর্মীর কাছ থেকে এসব স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগে থেকেই অবস্থান নেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এমিরেটস এয়ারলাইন্সের EK582 ফ্লাইটটি দুবাই থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর পর কর্মকর্তারা বিমানবন্দরের এপ্রোন এলাকায় নজরদারি শুরু করেন। পরে ২১ নম্বর গেটসংলগ্ন ৪ নম্বর বোর্ডিং ব্রিজের নিচের এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
অভিযানের সময় দুই বিমানকর্মীর গতিবিধি ও পরিচয় যাচাই করে তাদের তল্লাশি করা হয়। একপর্যায়ে তাদের পরা জুতার ভেতর বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণবারের সন্ধান পান কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। পরে জুতার ভেতর থেকে একে একে ৮০টি স্বর্ণবার বের করে জব্দ করা হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বর্ণবারগুলো এমনভাবে জুতার ভেতরে রাখা হয়েছিল, যাতে সাধারণভাবে বাইরে থেকে দেখলে বিষয়টি সহজে বোঝা না যায়।
উদ্ধার হওয়া স্বর্ণবারগুলোর প্রতিটির ওজন প্রায় ১১৭ গ্রাম। ৮০টি বারের সম্মিলিত ওজন প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হিসাবে জব্দ করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বিপুল পরিমাণ এই স্বর্ণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কীভাবে বিমানকর্মীদের কাছে পৌঁছাল, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ঘটনায় আটক দুই বিমানকর্মী হলেন মো. মানিক মিয়া ও মো. মিজানুর রহমান। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দুজনই Aircraft Technical Helper বা এয়ারক্রাফট টেকনিক্যাল হেলপার হিসেবে কর্মরত। বিমানকর্মীদের দায়িত্বের ধরন বিবেচনায় বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তাদের কাজের সুযোগ থাকায় তদন্তকারীরা কীভাবে স্বর্ণগুলো তাদের কাছে এসেছে এবং তারা কার নির্দেশে বা কী উদ্দেশ্যে এগুলো বহন করছিলেন, তা খতিয়ে দেখছেন।
তবে এখন পর্যন্ত কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের নির্দিষ্ট উৎস, এর প্রকৃত মালিক কিংবা ঢাকায় কার কাছে এগুলো পৌঁছানোর কথা ছিল—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো তথ্য জানানো হয়নি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকাতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালায়। যাত্রীদের পাশাপাশি বিমানবন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীদের চলাচলও নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় থাকে। এ ঘটনায় যাত্রী নয়, সরাসরি বিমানকর্মীদের জুতার ভেতর থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের বিষয়টি তাই বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্বর্ণ চোরাচালানের ক্ষেত্রে পাচারকারীরা কখনো লাগেজ, কখনো শরীরের বিভিন্ন অংশ বা পরিধেয় পোশাকের আড়ালে মূল্যবান ধাতু বহনের চেষ্টা করে থাকে। এবার জুতার ভেতর ৮০টি স্বর্ণবার লুকানোর ঘটনাটি সামনে আসায় চোরাচালানের কৌশল এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও তদন্তকারীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এই ঘটনায় ব্যবহৃত কৌশল কীভাবে কাজ করছিল এবং তা নিরাপত্তা তল্লাশি এড়িয়ে যেতে কীভাবে সক্ষম হয়েছিল, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্ধার করা স্বর্ণের উৎস এবং এর গন্তব্য শনাক্ত করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে এই চালানের সঙ্গে জড়িত সম্ভাব্য ব্যক্তি বা চক্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। দুই বিমানকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে পুরো ঘটনার নেপথ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার করা স্বর্ণবার জব্দ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালানের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে গ্রেপ্তার বা আটক হওয়া কোনো ব্যক্তিকে আদালতে অভিযোগ প্রমাণের আগে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সমীচীন নয়।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশপথে এমন বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, চোরাচালানকারীরা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পাশ কাটাতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করার চেষ্টা করে। এবার বিমানকর্মীদের জুতার ভেতরে লুকানো অবস্থায় স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় শুধু চালানটির উৎস ও গন্তব্য নয়, এর সঙ্গে সম্ভাব্য আরও কারা জড়িত এবং কীভাবে এই চালান বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করেছে, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
তদন্ত শেষে এ ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আপাতত ৮০টি স্বর্ণবার, প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি ওজন এবং আনুমানিক ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকার এই চালান জব্দ হওয়ার ঘটনাই শাহজালাল বিমানবন্দরে কাস্টমস গোয়েন্দাদের সাম্প্রতিক অভিযানের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে উঠেছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!