রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই একই সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ফলে আজ ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একজন সাধারণ ভোক্তার জন্য প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—সরকারি হিসাবে একটি ১২ কেজি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আসলে কত?

সর্বশেষ কার্যকর বিইআরসি নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। সেপ্টেম্বর মাসের জন্য এই দাম নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন এই দর কার্যকর হয় এবং পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা বহাল রাখার কথা জানানো হয়েছিল। আগের মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের সমন্বয়ে দাম ১৩ টাকা কমানো হয়েছিল।

বিইআরসির নির্ধারিত এই দামে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেপ্টেম্বরের মূল্য সমন্বয়ের সময় কমিশন প্রতি কেজি বেসরকারি বাজারজাত এলপিজির খুচরা মূল্য ১৩২ টাকা ১২ পয়সা নির্ধারণ করেছিল। সেই হিসাবে ১২ কেজি সিলিন্ডারের মূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। বিইআরসি জানিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সব লাইসেন্সধারী এলপিজি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানকে এই নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন করতে হবে।

তবে সরকারি নির্ধারিত দাম আর বাস্তব বাজারদরের মধ্যে এখন বড় ধরনের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দাম আরও বেশি, এমনকি ২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ১ হাজার ৫৮৫ টাকা সরকারি দরের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোক্তাকে ৭০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকারও বেশি দিতে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে শুধু দাম বেশি নেওয়াই নয়, অনেক এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ নিয়েও সংকট দেখা দিয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের কেউ কেউ বলছেন, তারা কোম্পানি বা ডিলার পর্যায় থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে এলপিজি পাচ্ছেন না। ফলে বাজারে সিলিন্ডারের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং সেই সুযোগে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠছে। আবার এলপিজি অপারেটরদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের সঙ্গে ভিন্নমতও জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর দাবি, দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত ও আমদানি রয়েছে।

সরকারও বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে। এলপিজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। ৩ অক্টোবর জ্বালানি ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এলপিজি আমদানিকারকদের বৈঠকও হয়েছে। এর আগে দেশের সব জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করে বাজার পরিস্থিতি ও অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এদিকে আজ ৪ অক্টোবর অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির নতুন দর ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে আজকের দিনে সরকারি দামের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার—নতুন অক্টোবরের দর কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত সর্বশেষ কার্যকর বিইআরসি মূল্য অনুযায়ী ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। নতুন মূল্য ঘোষণা হলে সেটি পরবর্তী কার্যকর দর হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই নতুন প্রজ্ঞাপন বা আদেশ প্রকাশের আগে ৪ অক্টোবরের জন্য অন্য কোনো সংখ্যাকে সরকারি নতুন দর হিসেবে উল্লেখ করা সঠিক হবে না।

এলপিজির দাম কেন প্রতি মাসে পরিবর্তিত হয়, সেটিও ভোক্তাদের জানা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির প্রধান উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের দাম, সৌদি আরামকোর নির্ধারিত কন্ট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপি, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খরচ বিবেচনা করে বিইআরসি নিয়মিতভাবে মূল্য সমন্বয় করে। সেপ্টেম্বরের মূল্য নির্ধারণেও সর্বশেষ সৌদি সিপি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

সেপ্টেম্বরের মূল্য সমন্বয়ের সময় সৌদি আরামকো প্রোপেনের কন্ট্রাক্ট মূল্য প্রতি টন ৬২৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেনের মূল্য ৬৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছিল। প্রোপেন ও বিউটেনের নির্ধারিত মিশ্রণ অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসি প্রতি কেজি এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে। এভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ভোক্তা পর্যায়ের এলপিজির দামে পড়ে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সরকারি দরের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের বিশাল ব্যবধান। একজন পরিবার যদি বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার পরিবর্তে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডার কেনেন, তাহলে তাকে অতিরিক্ত ৭১৫ টাকা দিতে হচ্ছে। আবার ২ হাজার ৫০০ টাকা হলে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় ৯১৫ টাকা। আর ২ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে কিনতে হলে সরকারি দামের তুলনায় অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে ১ হাজার ৩১৫ টাকা।

ফলে ভোক্তাদের জন্য শুধু অক্টোবর মাসে বিইআরসি নতুন কত টাকা দাম নির্ধারণ করে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং নির্ধারিত দাম বাস্তবে বাজারে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থাৎ আজ ৪ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত সর্বশেষ কার্যকর সরকারি দর অনুযায়ী ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে অক্টোবরের নতুন মূল্য আজ ঘোষণা হলে সেই দর পরবর্তী কার্যকর মূল্য হিসেবে গণ্য হবে। তাই ভোক্তাদের সিলিন্ডার কেনার সময় দোকানের মূল্যতালিকা, বিল বা ভাউচার দেখে নেওয়া এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে মিলিয়ে কেনাকাটা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিইআরসির সর্বশেষ মূল্যসংক্রান্ত তথ্য

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!