সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নতুন একটি আইনি কাঠামো কার্যকর হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দান করলেও দাতা নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। সংশোধিত এই বিধানকে পিতা-মাতা ও প্রবীণদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় সংসদে পাস এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পর গত ৮ সেপ্টেম্বর সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬। এটি ২০২৬ সালের ১০৫ নম্বর আইন। এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানের বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। আইনটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে।

সংশোধিত আইনের আওতায় বাবা-মা সন্তানকে, দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে, সন্তান পিতা-মাতা বা দাদা-দাদিকে, নাতি-নাতনি দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মধ্যে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। তবে দাতা চাইলে নিজের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

আইনে বলা হয়েছে, কোনো দাতা নিজের জীবদ্দশায় কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের জন্য রেখে দান করলে সেই দান বৈধ হবে। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঘোষণা এবং রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান সম্পন্ন করতে হবে।

নতুন বিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় দানগ্রহীতা মারা গেলেও দাতার ভোগাধিকার শেষ হবে না। সে ক্ষেত্রে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে গেলেও দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার বহাল থাকবে।

সংশোধিত আইনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ছিদ্দিক উল্লাহ্ মিয়া বলেন, নতুন আইনের ফলে সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দাতা নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তির পূর্ণ ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মালিকানা হস্তান্তর করতে পারবেন।

তার মতে, এই বিধান পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদের দায়িত্ববোধ বাড়ানোর পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কের ভিতও শক্তিশালী করতে পারে। প্রবীণ বয়সে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়, নতুন আইনি কাঠামো তার একটি সুষম সমাধানের পথ তৈরি করবে।

আইনে দান করা সম্পত্তি পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন বা বাতিলের বিষয়েও কিছু সুযোগ রাখা হয়েছে। সাধারণভাবে নিবন্ধিত দান অপ্রত্যাহারযোগ্য হলেও দাতা ও গ্রহীতা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সেই দানের ফলে সৃষ্ট অধিকার পরিবর্তন, বাতিল বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারবেন। তবে এর জন্য আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত ও যৌক্তিক প্রয়োজন থাকতে হবে।

কোনো পক্ষের সম্মতি নেওয়া সম্ভব না হলে, যেমন তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম বা অন্য কোনো আইনগত কারণে অক্ষম হলে, অপর পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন। জেলা জজ প্রয়োজনীয় বিষয় বিবেচনা করে সম্পত্তি বা সংশ্লিষ্ট অধিকারে স্বার্থ থাকা ব্যক্তিদের নোটিশ দিতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে তদন্ত বা অনুসন্ধান করতে পারবেন।

আইনে আরও বলা হয়েছে, আদালতের অনুমতির ক্ষেত্রে আবেদনটি সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে জেলা জজ সম্পত্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে সৃষ্ট অধিকার পরিবর্তন, বাতিল বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনার অনুমতি দিতে পারবেন।

এ বিষয়ে একলাছ ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশ সাংবিধানিক আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। প্রচলিত আইনি কাঠামোর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের পুরোনো বিধান সংশোধন করে জাতীয় সংসদ যে ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে, তা স্বাগত জানানোর মতো।

তিনি বলেন, সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর পিতা-মাতার করুণ পরিণতির অনেক ঘটনা সামনে এসেছে। সন্তানদের অবজ্ঞা ও দায়িত্বহীনতারও বহু নজির রয়েছে। তাই সংশোধিত আইনটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই বিধান শুধু সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করবে না, বরং সম্পত্তি দেওয়ার পরও দাতার জীবনকালীন অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পারিবারিক সংকট কমানো এবং প্রবীণদের আত্মমর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষায় আইনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!