চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের দ্রুতগতির ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল বেশ সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু পরীক্ষামূলকভাবে সেবা চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই একের পর এক সরঞ্জাম চুরির ঘটনায় বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে ট্রেনে স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা। চারটি আন্তনগর ট্রেনে স্থাপন করা প্রায় ৬০টি রাউটারের মধ্যে ৪৫টিই চুরি হয়ে গেছে। শুধু রাউটার নয়, ঢাকা-সিলেট রুটে চলাচলকারী উপবন এক্সপ্রেসের ছাদ থেকে স্টারলিংকের একটি ফ্ল্যাট অ্যান্টেনাও খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।

২০২৬ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের চলন্ত ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে সরাসরি স্যাটেলাইটভিত্তিক স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা চালু করে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড বা বিএসসিএল। ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে যাত্রীদের ভ্রমণ আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার পাশাপাশি দেশের গণপরিবহনে স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেট সংযোগ কতটা কার্যকর হতে পারে, তা যাচাই করাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যটক এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেস—এই চারটি আন্তনগর ট্রেনে সেবা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়।

এই ব্যবস্থায় ট্রেনের ছাদে স্যাটেলাইট সিগন্যাল গ্রহণের জন্য বিশেষ অ্যান্টেনা এবং বগির ভেতরে যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য ওয়াই-ফাই রাউটার স্থাপন করা হয়। ছাদের অ্যান্টেনা স্টারলিংক স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইন্টারনেট সংযোগ গ্রহণ করে। পরে সেই সংযোগ রাউটারের মাধ্যমে ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের ব্যবহারের উপযোগী ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হয়। ফলে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র নষ্ট বা চুরি হয়ে গেলে পুরো সংযোগ ব্যবস্থাই ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

কিন্তু সেবা চালুর পর থেকেই যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চারটি ট্রেনে মোট প্রায় ৬০টি রাউটার স্থাপন করা হয়েছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে এর মধ্যে ৪৫টি চুরি হয়ে যায়। অর্থাৎ স্থাপন করা রাউটারের মাত্র ১৫টি বর্তমানে টিকে আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুরি হওয়া যন্ত্রের পরিবর্তে নতুন রাউটার বসানো হলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলোরও কিছু আবার চুরি হয়েছে। শুধু রাউটার নয়, এর সঙ্গে যুক্ত তার ও কেবল চ্যানেলিংও খুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে ঢাকা-সিলেট রুটের উপবন এক্সপ্রেসে। নিয়মিত তদারকির সময় ওই ট্রেনের একটি স্টারলিংক অ্যান্টেনা থেকে সিগন্যাল না পাওয়ায় বিষয়টি বিএসসিএলের নজরে আসে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান, ট্রেনের ছাদে অ্যান্টেনাটি নেই। সেখানে পড়ে রয়েছে শুধু অ্যান্টেনা স্থাপনের হোল্ডার। অর্থাৎ অ্যান্টেনাটি খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই অ্যান্টেনা ছিল ট্রেনের স্টারলিংক সংযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অংশ। সেটি চুরি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ইন্টারনেট সংযোগও ব্যাহত হয়েছে।

প্রতিবেদনগুলোতে আরও জানা গেছে, চুরি হওয়া কিছু সরঞ্জাম পুনরায় স্থাপন করার চেষ্টা করা হলেও একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটেছে। এতে একদিকে পরীক্ষামূলক সেবার কার্যকারিতা কমছে, অন্যদিকে নতুন সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময় লাগছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, একটি প্রযুক্তিনির্ভর সরকারি সেবা স্থায়ীভাবে সম্প্রসারণের আগে তার অবকাঠামোগত নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জনবল সংকটকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামানও জনবল সংকটের কারণে অনেক মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ অবকাঠামো ও সম্পদের তুলনায় পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রতিটি ট্রেন এবং প্রতিটি সরঞ্জামকে আলাদাভাবে নজরদারিতে রাখা কঠিন।

এ ধরনের চুরি শুধু কয়েকটি রাউটার বা অ্যান্টেনা হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবা চালুর সক্ষমতার প্রশ্ন। বিশেষ করে ট্রেনের ছাদে থাকা যন্ত্রপাতি নিরাপদ রাখতে হলে প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি কারিগরি সমাধানও প্রয়োজন। অ্যান্টেনা ও রাউটার এমনভাবে স্থাপন করতে হবে, যাতে সাধারণভাবে তা খুলে নেওয়া কঠিন হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইসে অ্যালার্ম, জিপিএস বা অন্য কোনো পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ট্রেনের কোন অংশে কী ধরনের প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর মূল্য ও ব্যবহার সম্পর্কে যাত্রীদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্টেশন ও ট্রেন চলাচলের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের জন্য আলাদা রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমানের মতে, এই পরীক্ষামূলক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মূল প্রকল্প বাস্তবায়নে যেতে হবে। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ওয়েবসাইটেও তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, চলন্ত ট্রেনে স্টারলিংক ইন্টারনেট চালুর উদ্যোগ বাংলাদেশের গণপরিবহনে আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু শুরুতেই বিপুলসংখ্যক রাউটার এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টেনা চুরি হয়ে যাওয়ায় স্পষ্ট হয়েছে, প্রযুক্তি স্থাপন করলেই সেবা সফলভাবে পরিচালনা করা যায় না। এর সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করতে হয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর নজরদারি। পরীক্ষামূলক পর্যায়ের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে ট্রেনে স্টারলিংক বা এ ধরনের অন্য কোনো প্রযুক্তি সম্প্রসারণের আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!