মানুষ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতা ও সহজতা কামনা করে। পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব, পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার কিংবা নতুন কোনো কাজ শুরু করার আগে মনে নানা ধরনের চিন্তা ও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। একজন মুসলমানের জন্য এসব পরিস্থিতিতে নিজের চেষ্টা ও পরিশ্রমের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কাজ কঠিন মনে হলে কিংবা সামনে বড় কোনো দায়িত্ব থাকলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে দোয়া করা মুমিনের অন্যতম সুন্দর আমল। কোরআনে হজরত মূসা (আ.)-এর একটি অত্যন্ত অর্থবহ দোয়া বর্ণিত হয়েছে, যা কঠিন কাজ সহজ হওয়া এবং কথা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার জন্য পড়া যায়।

হজরত মূসা (আ.) যখন ফেরাউনের কাছে দাওয়াতের দায়িত্ব নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে নিজের কাজ সহজ করে দেওয়ার জন্য দোয়া করেছিলেন। সেই দোয়াটি সূরা ত্ব-হায় ২৫ থেকে ২৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। দোয়াটি হলো, “رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي، وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي، وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي، يَفْقَهُوا قَوْلِي”। বাংলা উচ্চারণ হলো, “রব্বিশরহ লী সদরী, ওয়া ইয়াসসির লী আমরী, ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানী, ইয়াফকাহু কাওলী।” এর অর্থ, “হে আমার রব, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন, আমার কাজ আমার জন্য সহজ করে দিন, আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।”

এই দোয়ার মধ্যে একজন মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রয়োজন একসঙ্গে রয়েছে। প্রথমেই আল্লাহর কাছে মনের প্রশান্তি ও সাহস চাওয়া হয়েছে। “রব্বিশরহ লী সদরী”—অর্থাৎ, “হে আমার রব, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন।” কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে মানুষের মধ্যে ভয়, অস্থিরতা কিংবা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তখন আল্লাহর কাছে অন্তর প্রশস্ত করে দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করা একজন মুমিনকে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করতে পারে।

এরপর বলা হয়েছে, “ওয়া ইয়াসসির লী আমরী”—অর্থাৎ, “আমার কাজ আমার জন্য সহজ করে দিন।” জীবনের অনেক কাজ মানুষের কাছে কঠিন মনে হতে পারে। কোনো পরীক্ষা, চাকরির সাক্ষাৎকার, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক কিংবা দায়িত্বপূর্ণ কাজের আগে এই দোয়ার মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর কাছে কাজটি সহজ করে দেওয়ার আবেদন করতে পারেন। এর অর্থ এই নয় যে দোয়া করলেই পরিশ্রমের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবে। বরং একজন মুমিন নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পাশাপাশি ফলাফল ও কাজের সহজতার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন।

দোয়ার তৃতীয় অংশে রয়েছে, “ওয়াহলুল উকদাতাম মিল লিসানী”—অর্থাৎ, “আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন।” এরপর বলা হয়েছে, “ইয়াফকাহু কাওলী”—“যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” এই অংশটি বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বক্তব্য, আলোচনা, সাক্ষাৎকার, শিক্ষকতা, উপস্থাপনা কিংবা মানুষের সামনে কথা বলার সময় প্রাসঙ্গিক হতে পারে। হজরত মূসা (আ.) আল্লাহর কাছে এমনভাবে কথা বলার সামর্থ্য চেয়েছিলেন, যাতে মানুষ তাঁর কথা বুঝতে পারে। তাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন বা বক্তব্যের আগে এই দোয়া পড়ে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া যেতে পারে।

তবে দোয়া সম্পর্কে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ইসলাম দোয়াকে পরিশ্রমের বিকল্প হিসেবে শিক্ষা দেয় না। একজন মুসলমান কোনো কাজের সফলতার জন্য দোয়া করার পাশাপাশি কাজটি সঠিকভাবে করার প্রস্তুতি নেবেন, প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করবেন, নিজের ভুল সংশোধন করবেন এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। এরপর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবেন। এটিই তাওয়াক্কুলের সুন্দর দৃষ্টান্ত—চেষ্টা করা এবং একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।

কাজ শুরু করার আগে এই দোয়া পড়ার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের দুর্বলতার কথা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে পারেন। কারণ মানুষের জ্ঞান, শক্তি ও সামর্থ্য সীমিত। একটি কাজের পরিণতি কী হবে, কোথায় কী বাধা আসবে কিংবা কোন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে কী ফল দেবে—সবকিছু মানুষ জানে না। আল্লাহ সবকিছু জানেন। তাই গুরুত্বপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া একজন মুমিনের জন্য স্বাভাবিক ও সুন্দর অভ্যাস।

দোয়াটি মুখস্থ করা কঠিন নয়। পুরো দোয়াটি একসঙ্গে পড়া সম্ভব না হলে ধীরে ধীরে মুখস্থ করা যেতে পারে। প্রথমে “রব্বিশরহ লী সদরী” অংশটি মুখস্থ করা যায়। এরপর “ওয়া ইয়াসসির লী আমরী” এবং ধীরে ধীরে বাকি অংশগুলো শেখা যেতে পারে। আরবি পড়ার পাশাপাশি এর অর্থ জানা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অর্থ বুঝে দোয়া করলে মানুষ আরও সচেতনভাবে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরতে পারে।

কাজে সফলতা বলতে শুধু অর্থ, পদ বা বাহ্যিক অর্জনকে বোঝায় না। একজন মুসলমানের জন্য প্রকৃত সফলতার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি, হালাল উপার্জন, সৎ থাকা এবং মানুষের উপকার করাও জড়িত। কোনো কাজ থেকে প্রচুর অর্থ পাওয়া গেলেও যদি তা হারাম উপায়ে হয়, তাহলে সেটি একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা নয়। একইভাবে কোনো কাজে বাহ্যিকভাবে ব্যর্থতা এলেও যদি মানুষ হালাল পথে চেষ্টা করে, ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, তাহলে সেই প্রচেষ্টা তার জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে।

তাই গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের আগে এই দোয়াটি পড়ার পাশাপাশি নিজের উদ্দেশ্যও যাচাই করা উচিত। কাজটি কি হালাল? এতে কি অন্য কারও ক্ষতি হবে? আমি কি যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েছি? আমার উদ্দেশ্য কি ভালো? এসব প্রশ্ন একজন মুসলমানকে নিজের কাজের ব্যাপারে সচেতন হতে সাহায্য করে। এরপর আল্লাহর কাছে বলা যেতে পারে—হে আল্লাহ, আমার অন্তর প্রশস্ত করে দিন, আমার কাজ সহজ করে দিন এবং আমাকে সঠিকভাবে কথা বলার ও কাজ করার তাওফিক দিন।

কোরআনে বর্ণিত হজরত মূসা (আ.)-এর এই দোয়াটি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়; বরং এর অর্থ ও শিক্ষা মানুষের জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে যখন কোনো কাজ নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়, সামনে বড় দায়িত্ব থাকে অথবা নিজের সামর্থ্য নিয়ে ভয় তৈরি হয়, তখন আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া মুমিনের জন্য প্রশান্তির কারণ হতে পারে।

আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ অনেক সময় নিজের সামর্থ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে এবং কাজের ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ইসলাম মানুষকে চেষ্টা করতে বলে, কিন্তু একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় যে সব ক্ষমতার উৎস আল্লাহ। তাই কোনো কাজ শুরু করার আগে আল্লাহকে স্মরণ করা, দোয়া করা, সঠিক প্রস্তুতি নেওয়া এবং এরপর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা করা একজন মুসলমানের জন্য সুন্দর পথ।

কাজে সফলতা ও সহজতার জন্য পড়ার এই দোয়াটি তাই শুধু মুখস্থ করার বিষয় নয়; এর প্রতিটি শব্দের মধ্যে রয়েছে একজন বান্দার আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার গভীর আবেদন। “হে আমার রব, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন, আমার কাজ আমার জন্য সহজ করে দিন, আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে আন্তরিকভাবে এই দোয়া পড়ে নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করলে একজন মুমিনের মনে আল্লাহর ওপর ভরসা ও মানসিক দৃঢ়তা তৈরি হতে পারে। আর সফলতা এলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং প্রত্যাশামতো ফল না এলে ধৈর্য ধারণ করাও মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!