ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে দেশের বিভিন্ন খাতের ২২টি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ইন্ডাস্ট্রি অ্যাকাডেমিয়া কোলাবোরেশন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘শিক্ষা শিল্পের ঐকতান, কর্মসংস্থানের সমাধান’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার সমন্বয়, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রমুখী করে গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। শনিবার ৩ অক্টোবর সকালে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এমন একটি বড় পরিসরের ইন্ডাস্ট্রি অ্যাকাডেমিয়া সংযোগ কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রাণ আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড, আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, আবুল খায়ের গ্রুপ, বেটোপিয়া গ্রুপ, টেলিটক, বেনকিউ, টেকনোডেরা, টিপি লিংক বাংলাদেশ, সিঙ্গার, আকিজ রিসোর্স, মেটাডোর ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড, বিকাশ, ডিবিসি নিউজ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. এমতাজ হোসেন, ট্রেজারার ড. ইদ্রিস আলী, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমানসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে পুরো আয়োজনটি শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরির একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
অনুষ্ঠানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বলেন, বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় না হলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ চাকরির বাজারে প্রবেশের পর নতুন করে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের চ্যালেঞ্জে পড়তে পারেন। তাই শিক্ষাজীবনেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ বাড়ানো, ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি এবং বাস্তবভিত্তিক প্রকল্পে কাজের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতে, এ ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত হবেন না, বরং শিল্পখাতের প্রকৃত সমস্যা সম্পর্কে ধারণা নিয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজেও যুক্ত হতে পারবেন। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া দক্ষ ও প্রশিক্ষিত তরুণদের সম্পর্কে আগেভাগে ধারণা পাওয়ার সুযোগ পাবে। এতে নিয়োগদাতা ও চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে দক্ষতার যে ব্যবধান থাকে, সেটি কমানো সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন। অনুষ্ঠানে ইবি শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বক্তব্যে। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল প্রতিটি ডিসিপ্লিনের কারিকুলামে তিন ক্রেডিট সমমানের ১০০ নম্বরের একটি ইন্ডাস্ট্রি রিলেটেড কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে শিল্পখাতের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সংযোগ তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও উপাচার্যের এই ঘোষণাকে অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরেছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কর্মক্ষেত্রের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কারিকুলামে শিল্পসংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতা যুক্ত করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গবেষণা, একাডেমিক কার্যক্রম ও পারস্পরিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথাও জানান।
উপাচার্য আরও বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তুত রয়েছে। এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে যুক্ত করার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ থাকলে উভয় পক্ষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশার মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় তৈরি হতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।
তিনি জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের ম্যান্ডেটকে একটি সুনির্দিষ্ট পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
উপদেষ্টা আরও বলেন, সাধারণ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানের জায়গা হিসেবে দেখলে হবে না। এসব প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের নাগরিকত্ববোধের পাশাপাশি নতুন ধারণা বাস্তবায়ন ও উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ তৈরিতে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এ কর্মসূচির গুরুত্ব শুধু একটি দিনের মতবিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে ইন্ডাস্ট্রি রিলেটেড কোর্স যুক্ত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময় থেকেই চাকরির বাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা প্রকল্প এবং চাকরির সুযোগের পরিধিও বাড়তে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিল্পখাতের সঙ্গে এমন সহযোগিতা বর্তমানে উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। কারণ প্রযুক্তির পরিবর্তন, অটোমেশন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের কারণে শুধু প্রচলিত একাডেমিক জ্ঞান দিয়ে চাকরির বাজারের সব চাহিদা পূরণ করা কঠিন। শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ, নেতৃত্ব এবং বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর দক্ষতাও প্রয়োজন। ইন্ডাস্ট্রি অ্যাকাডেমিয়া কোলাবোরেশনের মতো উদ্যোগ এসব দক্ষতা তৈরির সুযোগ বাড়াতে পারে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের বাস্তব চাহিদার একটি স্থায়ী সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। ২২টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এবং কারিকুলামে শিল্পসংশ্লিষ্ট কোর্স যুক্ত করার সিদ্ধান্ত সেই প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন এই সহযোগিতার আওতায় এমওইউ, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং নিয়োগের সুযোগগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপরই উদ্যোগটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!