জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসনে সাত দিনের একটি রোডম্যাপ সামনে এনেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের নির্ধারিত শর্ত মেনে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং জব্দ থাকা ইরানি অর্থের একটি অংশ ছাড়সহ কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রস্তাবটি কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটিই এই প্রস্তাবের গুরুত্ব বোঝার মূল বিষয়। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের এক-চতুর্থাংশের বেশি হরমুজ দিয়ে গেছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই পথ ব্যবহার করেছে। ফলে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়ে।

ইরানের নতুন পরিকল্পনার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাত কয়েক মাস ধরে চলেছে এবং মাঝখানে সাময়িক যুদ্ধবিরতিও হয়েছিল। এরপর হরমুজকে ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আবার বাড়ে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আরাগচি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সাত দিনের সময়সূচি অনুযায়ী প্রথম কয়েক দিন সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এরপর হরমুজ খুলে দেওয়া এবং পরের ধাপে পারমাণবিক কর্মসূচিসহ পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা ছাড়, জব্দ থাকা ইরানি সম্পদের অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড় এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির বিষয় রয়েছে। লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় রাখার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে এসেছে। কিছু প্রতিবেদনে ইয়েমেনকেও আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আরাগচির প্রকাশ্য ব্যাখ্যায় ইয়েমেনের বিষয়টি কতটা আনুষ্ঠানিক শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল, তা নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে।

ইয়েমেন প্রসঙ্গটি আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, ইয়েমেনে সংঘাত বন্ধ করাও তেহরানের দাবির অংশ। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, আরাগচির ঘোষিত পরিকল্পনায় ইয়েমেনের বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। ফলে ইরানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রস্তাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

হরমুজ নিয়ে ইরানের অবস্থান শুধু জলপথটি খুলে দেওয়া না খোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আগের একটি সমঝোতার সময়ও জাহাজ চলাচলের নিয়ম নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনের সমঝোতায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের সুযোগ রাখা হলেও পরবর্তী সময়ে কোন জাহাজ কীভাবে চলাচল করবে এবং ইরানের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে কি না, তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। ইরান কিছু জাহাজকে অনুমোদনবিহীন রুট ব্যবহারের অভিযোগে লক্ষ্যবস্তু করার পর সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে।

এই কারণেই নতুন সাত দিনের পরিকল্পনায় ‘স্বাভাবিক নৌ চলাচল’ কথাটির বাস্তব অর্থ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আরাগচি বলেছেন, শর্ত পূরণ হলে স্বাভাবিক সামুদ্রিক চলাচল পুনরুদ্ধার করা হবে। কিন্তু আগের সমঝোতার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, হরমুজের নিরাপত্তা, জাহাজ চলাচলের নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়ে স্থায়ী সমাধান করা কঠিন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে কোনো নতুন অনুমোদনভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি হলে সেটি ভবিষ্যতে কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের এই প্রস্তাবকে কেবল কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হবে, নাকি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে দেখা হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। ব্যবহারকারীর দেওয়া মূল লেখাটিও ইরানের পদক্ষেপকে মূলত দর-কষাকষির কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তবে এটি লেখকের বিশ্লেষণ; ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, তাদের প্রস্তাবের উদ্দেশ্য হলো সংঘাত বন্ধ করা, হরমুজে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা এবং আলোচনার পথ পুনরায় চালু করা। আরাগচি প্রকাশ্যে বলেছেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে তেহরান হরমুজ খুলতে প্রস্তুত।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানায়, আরাগচি কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন। এতে বোঝা যায়, প্রকাশ্যে মতপার্থক্য থাকলেও কূটনৈতিক যোগাযোগের চ্যানেল সক্রিয় রয়েছে।

আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সময়সূচি। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় জ্বালানি ও জ্বালানির দাম নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে চাপ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও ইরানের প্রস্তাবের সময় এবং মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছে। তবে ইরানের সিদ্ধান্ত যে সরাসরি মার্কিন নির্বাচনী হিসাবের ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়েছে, এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। এটি মূলত বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদনের ব্যাখ্যার অংশ।

এরই মধ্যে হরমুজের পাশাপাশি ইয়েমেনের বাব আল-মান্দাব প্রণালিও আঞ্চলিক উত্তেজনার আরেকটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুতিদের ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় সৌদি আরব ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সময়ে পাকিস্তান জানিয়েছে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছে। ফলে হরমুজের সংকট এখন পারস্য উপসাগরের বাইরেও বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের শর্ত কতটা শিথিল করতে পারে। ইরান হরমুজ খুলে দেওয়ার আগে নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও জব্দ অর্থের বিষয়ে ছাড় চাচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র শুধু জলপথ খুলে দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বৃহত্তর নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতা চাইছে। মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রাখলেও সমঝোতার শর্ত ও কোন পদক্ষেপ আগে বাস্তবায়ন হবে, তা এখনো বড় বাধা হয়ে আছে।

ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সামনে আসা ইরানের সাত দিনের পরিকল্পনাকে শুধু হরমুজ খোলার প্রস্তাব হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যুদ্ধবিরতি, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো, তেল রপ্তানির সুযোগ, জব্দ অর্থ, নৌ অবরোধ, পারমাণবিক আলোচনা এবং ইয়েমেন ও লেবাননের মতো আঞ্চলিক সংঘাত। সামনে কূটনৈতিক আলোচনায় এসব প্রশ্ন কীভাবে সমাধান হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে হরমুজে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমঝোতার পথ তৈরি হয় কি না।

সূত্র ও প্রেক্ষাপট: আল জাজিরায় প্রকাশিত বিশ্লেষণধর্মী লেখায় সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার সুলেইমান আল-আকিলি ইরানের প্রস্তাবকে কৌশলগত দর-কষাকষির দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেছেন। সেই বিশ্লেষণের পাশাপাশি রয়টার্স, এপি, আল জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য মিলিয়ে ওপরের প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। মূল লেখায় উল্লেখ করা কিছু অপ্রকাশিত নথি ও নির্দিষ্ট দাবির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি, তাই সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!