দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশ ভালো নেই, মানুষ কষ্টে আছে। শুধু ধর্মীয় বয়ান বা নামাজের ইমামতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে আলেম-ওলামাদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। জ্ঞান ও আমলের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের জন্য মুফাসসিরদের প্রস্তুতি নেওয়ারও আহ্বান জানান জামায়াত আমির।

শনিবার ৩ অক্টোবর রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ ভবনে আয়োজিত জাতীয় মুফাসসির সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের জাতীয় কাউন্সিল ও মুফাসসির সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আলেম ও মুফাসসিররা অংশ নেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষের সমস্যা শুধু খাওয়া-পরা বা অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সম্মান ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আলেম-ওলামাদের প্রতি সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি ও অন্যায়ের বিষয়ে দায়িত্বশীলভাবে কথা বলার আহ্বান জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে আলেমদের নিজেদের জ্ঞান ও আমলের মাধ্যমে প্রস্তুত হতে হবে।

তিনি বলেন, যুগে যুগে নবী-রাসুলরা মানুষকে পথ দেখিয়েছেন। সেই দিকনির্দেশনার দায়িত্বের ধারাবাহিকতায় ওলামায়ে কেরামকেও সমাজে পথ দেখানোর ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে অন্যদের কোনো বিষয়ে আহ্বান জানানোর আগে নিজেদের জীবনেও সেই আমল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার বক্তব্যে আত্মশুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা ও বাস্তব জীবনে ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জাতীয় সংসদ প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। তার দাবি, জাতীয় সংসদ দেশের আইন প্রণয়ন, সংশোধন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সংসদে এমন কোনো আইন বা বিল পাস হয়ে থাকলে যা কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আলেমরা মনে করেন, সে বিষয়ে তাদের দায়িত্বশীলভাবে কথা বলা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে এ ক্ষেত্রে কাউকে অপমান বা তিরস্কার না করে ভদ্র ও গঠনমূলক ভাষায় ভুল থেকে সঠিক পথে আসার আহ্বান জানানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল আলেমদের সামাজিক ভূমিকা। তিনি ধর্মীয় জ্ঞানকে শুধু বক্তব্য বা ওয়াজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের কল্যাণ ও সমাজের বিভিন্ন দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সমাজে অন্যায় বা অসঙ্গতি দেখা দিলে আলেমদের তা নিয়ে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীলভাবে কথা বলতে হবে। একই সঙ্গে তাদের বক্তব্য যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি না করে, সেদিকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সম্মেলনে আলেম সমাজের ভাবমূর্তি ও মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও কথা বলেন জামায়াত আমির। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার বক্তব্যের বরাতে বলা হয়েছে, দু-একটি অঘটনের কারণে পুরো আলেম সমাজ বা মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক নয়। একই সঙ্গে তিনি আলেমদের নিজেদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে মাদরাসা শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে আসে।

সম্মেলনের আগে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের জাতীয় কাউন্সিলে সংগঠনটির নতুন কমিটিও গঠন করা হয়। মাওলানা আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে মাওলানা নুরুল আমিন এমপিকে সভাপতি এবং মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালীকে সেক্রেটারি করে ১০১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠনের তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

নতুন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর সম্মেলনে বক্তব্য দেন মাওলানা নুরুল আমিন এমপি। তিনি জাতীয় সংসদকে কোরআনের শিক্ষার আলোকে আলোকিত করার কথা বলেন। এজন্য সংশ্লিষ্টদের সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার বক্তব্যে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ওলামা কমিটির সভাপতি মাওলানা আব্দুল হালিমও বক্তব্য দেন। তিনি আলেমদের ঐক্য রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বাংলাদেশবিরোধী কোনো বক্তব্য না দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি মানুষের আচরণ ও কথাবার্তার মাধ্যমে বিরোধ বা দূরত্ব না বাড়িয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ওলামা কমিটির সেক্রেটারি ড. খলিলুর রহমান মাদানী, ড. সামিউল হক ফারুকী, মাওলানা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী এবং মুফতি আমির হামজা এমপি। তারা আলেম সমাজের ভূমিকা, সংগঠনের কার্যক্রম এবং ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন বলে আয়োজকপক্ষের অনুষ্ঠানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় মুফাসসির সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলেম-ওলামাদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা। তিনি অন্যায় ও অসঙ্গতির বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে শালীনতা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং নিজেদের আচরণে উদাহরণ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে নতুন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের সাংগঠনিক কার্যক্রমও নতুন নেতৃত্বে এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা এসেছে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!