জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়ে একটি বিস্তৃত রোডম্যাপ উন্মোচন করেছে সরকার। এতে দেশীয় জ্বালানি সম্পদ উত্তোলনের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ, গ্যাস অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় জাতীয় গ্রিডে প্রক্ষেপিত ২০ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াট সর্বোচ্চ চাহিদা পূরণে নতুন করে ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বড়পুকুরিয়ায় ৩০০ মেগাওয়াট, পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এবং মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তিন প্রকল্প মিলিয়ে এসব কেন্দ্র থেকে ২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড ও বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সিরাজগঞ্জ, সোনাগাজী ও রামপালে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ওপেক্স মডেলের আওতায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা হচ্ছে। ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ উদ্যোগে ১ হাজার ৪০০ আবেদনকারী ফরম সংগ্রহ করেছেন বলে রোডম্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের ৩৫ কোটি ডলারের ঋণের প্রাথমিক অনুমোদন রয়েছে। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গেও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে।
২০২৬-২৭ মেয়াদের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রাক্কলিত ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে গ্যাস ও কয়লা থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট করে, তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ আমদানি থেকে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের বিস্তার বাড়াতে সোলার সরঞ্জাম আমদানির শুল্ক ৬৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ এবং অগ্রিম আয়কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ কেনার দর ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৪০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করা, ক্ষুদ্র মড্যুলার রিয়্যাক্টর (এসএমআর) প্রযুক্তি যুক্ত করা এবং বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ বাড়াতেও একাধিক উদ্যোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার এমএমসিএফডি সক্ষমতার একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, কুতুবদিয়ায় ৬০০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার এফএসআরইউ স্থাপনে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এবং ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ফেনী-বাখরাবাদ গ্যাস পাইপলাইনের জরিপ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। প্রথম ধাপে নির্ধারিত ১৫০টি অনুসন্ধান কূপের মধ্যে ৩১টির খনন শেষ হয়েছে। ২০৩১ থেকে ২০৩৫ মেয়াদে আরও ১৫০টি কূপ খননের দ্বিতীয় ধাপের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের জন্য ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’-এর আওতায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
তবে রোডম্যাপের আর্থিক টেকসইতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকেরা। নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, পরিকল্পনায় সমন্বিত আর্থিক বিশ্লেষণ ও অর্থায়নের স্পষ্ট উৎসের ঘাটতি রয়েছে। আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের পরিবেশগত ঝুঁকি ও ব্যয়ের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশবিষয়ক লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ব্যয়বহুল তরল জ্বালানি ও এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
রোডম্যাপে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫৭০ মেগাওয়াট। এক বছরের ব্যবধানে তা ১৭ শতাংশ বেড়ে ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ১৮ হাজার ১৭৮ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ২৭১ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার ৮৭৫ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৭১৯ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ২ হাজার ৮১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছিল।
অন্যদিকে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর জন্য মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৫ হাজার ৮৫৯ মেগাওয়াট প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ৫ হাজার ৯৭৭ মেগাওয়াট এবং কয়লাভিত্তিক উৎপাদন ৪ হাজার ৩৬৩ মেগাওয়াট হতে পারে। কয়লার ঘাটতি ও বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে ৩ হাজার ৭৯১ মেগাওয়াট করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!