ওয়ালস্ট্রিটের বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সম্প্রতি নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ১৫টি বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ১৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, তাদের অনেকেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে সব প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করবে এমন নয়। পর্যায়ক্রমে অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর রাজধানীর হোটেল পূর্বাণীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের আইসিবির সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। একই অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগনির্ভর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রবেশ করতে পারেন এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কার্যক্রম দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে পারেন, সে জন্য বাজারের কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিএসইসি ইতোমধ্যে বেশ কিছু ডিরেগুলেশন বা বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আরও সংস্কার প্রয়োজন। কাগজপত্রের ব্যবহার কমিয়ে পুঁজিবাজারের কার্যক্রম পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে আইসিবিকেও ডিজিটাইজেশনের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের এই অংশে পুঁজিবাজারের প্রতিটি স্তরে অটোমেশন, ডিজিটালাইজেশন ও পেপারলেস কার্যক্রমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখন অনেকটাই রিটেইল বা খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর। অথচ বিশ্বের অনেক উন্নত পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে বাংলাদেশের বাজারকে ধীরে ধীরে রিটেইলনির্ভর কাঠামো থেকে বের করে একটি শক্তিশালী ইনস্টিটিউশনাল ইনভেস্টমেন্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগনির্ভর বাজারে রূপান্তরের বড় সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইসিবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

আইসিবির ভূমিকা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। বিভিন্ন সময় নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান অবস্থানে এসেছে। এখন বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইসিবিকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারি সুবিধার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতার মাধ্যমে বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়। আইসিবিকে কর মওকুফ বা বিশেষ কোনো বড় সুবিধা দিয়ে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। বাজারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই আইসিবিকে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে।

আইসিবির মূলধন পুনর্গঠনসহ প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় আইসিবিকে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে এবং দেশের পরিবর্তিত পুঁজিবাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমেও পরিবর্তন আনতে হবে।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আর্থিক খাতে রাজনৈতিক নিয়োগের বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে না। বিভিন্ন ধরনের চাপ থাকলেও সরকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেশাদার ও কার্যকর রাখার বিষয়ে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে জানান তিনি। এ বক্তব্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনেও আর্থিক খাতে রাজনৈতিক নিয়োগ না দেওয়ার সরকারি অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আইসিবির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার পর আইসিবিকে অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাজারভিত্তিক ও মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাওয়া এবং পুঁজিবাজারকে সেই অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে কাজে লাগানোও আইসিবির প্রতিষ্ঠাকালীন ধারণার অংশ ছিল।

তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজারের কাঠামো ও বিনিয়োগের ধরন বদলেছে। ফলে আইসিবিকেও বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করতে হবে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন বিনিয়োগ পরিবেশে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, একসময় আইসিবির তেমন কোনো প্রতিযোগী ছিল না। কিন্তু বর্তমানে পুঁজিবাজারে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। তাই টিকে থাকতে আইসিবিকে আরও পেশাদার হতে হবে। তিনি বিশেষভাবে আইসিবির পোর্টফোলিও রিব্যালেন্সিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

মাসুদ খান বলেন, আইসিবির পোর্টফোলিওতে এমন অনেক শেয়ার রয়েছে, যেগুলোর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে সেগুলোর দাম বাড়ার সম্ভাবনাও কম। এসব বিনিয়োগ পর্যালোচনা করে সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, দেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনীতির স্বার্থে আইসিবির মতো একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকরভাবে টিকে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করতে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি আইসিবিকেও নিজেদের জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করতে হবে।

আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দেশের পুঁজিবাজার, শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে আইসিবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পুঁজিবাজারে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা চালুর ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির অবদান রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত ও অনিয়মের কারণে একসময় শক্তিশালী এই প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, বর্তমানে আইসিবি যে পরিমাণ পরিচালন মুনাফা করছে, তার তুলনায় সুদ ব্যয়ের চাপ অনেক বেশি। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে প্রতিষ্ঠানটির মূলধন পুনর্গঠন এবং বিশেষ তহবিলের প্রয়োজন রয়েছে। দেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনীতির স্বার্থে আইসিবির মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আইসিবির সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক এবং আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আইসিবিকে নতুন বাস্তবতায় আরও প্রতিযোগিতামূলক করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ওয়ালস্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য আগ্রহকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে নিয়ন্ত্রক কাঠামো, প্রযুক্তি, স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব এবং বাজারের অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনার পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজারের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরই তাই জোর দিয়েছেন তিনি।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!