রান্না শেষ হওয়ার পর গরম ভাত, তরকারি, ডাল বা মাংস ফ্রিজে রাখা নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা রয়েছে। প্রচলিত ধারণা হলো, খাবার পুরোপুরি ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত বাইরে রাখতে হবে, তারপর ফ্রিজে রাখতে হবে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকে দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া বরং বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন FDA-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, গরম খাবার ফ্রিজে রাখলে ফ্রিজের ক্ষতি হয়—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং রান্না করা খাবার ও অবশিষ্ট খাবার দ্রুত ঠান্ডা করে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ফুটন্ত গরম খাবারের বিশাল হাঁড়ি সরাসরি ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিলেই সবচেয়ে ভালো হবে। বড় পরিমাণ গরম খাবার একসঙ্গে একটি গভীর পাত্রে রাখলে খাবারের মাঝের অংশ ধীরে ঠান্ডা হতে পারে। তাই রান্না করা খাবার বেশি পরিমাণ হলে ছোট ছোট ও অপেক্ষাকৃত অগভীর পাত্রে ভাগ করে ফ্রিজে রাখা ভালো। FDA এবং USDA দুটো সংস্থাই দ্রুত ও সমানভাবে ঠান্ডা করার জন্য বড় পরিমাণ অবশিষ্ট খাবার অগভীর পাত্রে ভাগ করার পরামর্শ দেয়।
এর প্রধান কারণ হলো ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি। রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকলে ক্ষতিকর জীবাণু দ্রুত বাড়তে পারে। FDA-এর তথ্যমতে, পচনশীল খাবার, রান্না করা খাবার ও leftovers সাধারণত রান্না বা পরিবেশনের দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখা উচিত। বাইরের তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে এই সময়সীমা এক ঘণ্টায় নেমে আসে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দুপুরে রান্না করা ভাত বা তরকারি কয়েক ঘণ্টা রান্নাঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে সন্ধ্যায় ফ্রিজে দেওয়ার অভ্যাস নিরাপদ নয়। খাবার দেখতে বা গন্ধে স্বাভাবিক মনে হলেও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যেতে পারে। তাই খাবার ঠান্ডা হওয়ার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে রেখে দেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা ভালো।
তাহলে গরম খাবার ফ্রিজে রাখলে কি ফ্রিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে? খাবার গরম হওয়ার কারণে কিছু সময়ের জন্য ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু FDA স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, গরম খাবার ফ্রিজে রাখলে ফ্রিজের ক্ষতি হয়—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং খাবার দ্রুত নিরাপদ তাপমাত্রায় নিয়ে আসা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো বড় হাঁড়ি সরাসরি ফ্রিজে না রেখে খাবার ভাগ করে রাখা। ধরুন, অনেকটা গরম খিচুড়ি, বিরিয়ানি বা মাংস রান্না হয়েছে। পুরো হাঁড়িটি ফ্রিজে ঢুকিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে পরিষ্কার ও অগভীর কয়েকটি পাত্রে ভাগ করে রাখা ভালো। এতে খাবারের তাপ দ্রুত বের হতে পারে এবং ঠান্ডা হওয়ার প্রক্রিয়াও তুলনামূলক দ্রুত হয়। একই সঙ্গে ফ্রিজের ভেতরে ঠান্ডা বাতাস চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা দরকার। FDA-ও ফ্রিজ অতিরিক্ত ভর্তি না করার পরামর্শ দিয়েছে।
খাবার সংরক্ষণের সময় ঢাকনা ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। খাবার অগভীর পাত্রে ভাগ করার পর উপযুক্ত ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা উচিত। এতে ফ্রিজের অন্য খাবারের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ কমে এবং খাবারের গন্ধ একে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও কমে। USDA leftovers সংরক্ষণের ক্ষেত্রে airtight lid, plastic wrap বা aluminium foil ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছে।
ফ্রিজের তাপমাত্রাও ঠিক রাখা জরুরি। FDA-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, ঘরের ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখা উচিত। আর ফ্রিজারের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শুধু ফ্রিজের নিজস্ব temperature setting-এর ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন হলে refrigerator thermometer ব্যবহার করে প্রকৃত তাপমাত্রা পরীক্ষা করা যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাবার ফ্রিজে রাখার পর কতদিন খাওয়া যাবে। USDA-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা refrigerated leftovers সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ব্যবহার করা উচিত; এর বেশি সময় রাখতে হলে ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
তবে খাবার একবার দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকলে পরে ফ্রিজে রাখলেই সেটি নিরাপদ হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। দুই ঘণ্টার বেশি সময় বাইরে থাকা পচনশীল খাবার, বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় এক ঘণ্টার বেশি বাইরে থাকা খাবার, নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই পরে ফ্রিজে রাখার চেয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খাবার সংরক্ষণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, গরম খাবার একেবারে ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে রান্না করা খাবারকে ছোট ও অগভীর পাত্রে ভাগ করে দ্রুত ফ্রিজে রাখা যায়। খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্রুত নিরাপদ তাপমাত্রায় নিয়ে আসা, খাবার ঢেকে রাখা এবং ফ্রিজের তাপমাত্রা ঠিক রাখা। প্রচলিত ধারণার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাবার বাইরে রেখে দেওয়ার চেয়ে নিরাপদ সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!