বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা উঠলেই ঘরের আলো ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। বিশেষ করে বেশি সময় আলো জ্বালাতে হয় এমন বাসা, দোকান ও অফিসে পুরোনো ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের পরিবর্তে LED ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ খরচ কতটা কমানো সম্ভব, তা নিয়ে অনেকেরই আগ্রহ রয়েছে। বাস্তবে LED বাল্ব কম বিদ্যুৎ খরচ করে বেশি আলো দেওয়ার সক্ষমতার কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। তবে LED ব্যবহার করলেই পুরো বিদ্যুৎ বিল ৮০ বা ৯০ শতাংশ কমে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। সাশ্রয় হবে মূলত আলোর পেছনে যে বিদ্যুৎ খরচ হয়, সেই অংশে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ENERGY STAR কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, মানসম্মত LED বাল্ব সাধারণ ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের তুলনায় সর্বোচ্চ প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম শক্তি ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে LED-এর আয়ুও সাধারণ ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বাল্ব কেনা ও পরিবর্তনের খরচও কমতে পারে।
বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে হলে প্রথমে ওয়াট ও লুমেনের পার্থক্য জানা প্রয়োজন। ওয়াট দিয়ে কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র কত পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তা বোঝানো হয়। অন্যদিকে লুমেন দিয়ে বোঝানো হয় একটি আলো কতটা উজ্জ্বল। তাই বাল্ব কেনার সময় শুধু ওয়াটের দিকে তাকানো ঠিক নয়। প্রয়োজনীয় উজ্জ্বলতার জন্য কত লুমেন আলো পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও দেখা জরুরি।
ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বে বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে একটি ধাতব ফিলামেন্টকে অত্যন্ত উত্তপ্ত করা হয়। সেই উত্তপ্ত ফিলামেন্ট থেকেই আলো তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত শক্তির বড় একটি অংশ আলোতে পরিণত না হয়ে তাপ হিসেবে বের হয়ে যায়। ENERGY STAR-এর তথ্য অনুযায়ী, ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বে ব্যবহৃত শক্তির প্রায় ৯০ শতাংশ তাপ হিসেবে নষ্ট হতে পারে। LED প্রযুক্তিতে তুলনামূলকভাবে কম শক্তি ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় আলো তৈরি করা সম্ভব।
ধরা যাক, কোনো ঘরে ৬০ ওয়াটের একটি সাধারণ বাল্ব প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা জ্বালানো হয়। তাহলে ওই বাল্বের দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে ০ দশমিক ০৬ কিলোওয়াট ঘণ্টা গুণ ৮ ঘণ্টা, অর্থাৎ ০ দশমিক ৪৮ ইউনিট। ৩০ দিনে ব্যবহার হবে ১৪ দশমিক ৪ ইউনিট।
এবার একই সময় ৯ ওয়াটের একটি LED বাল্ব ব্যবহার করা হলে দৈনিক বিদ্যুৎ খরচ হবে ০ দশমিক ০০৯ কিলোওয়াট ঘণ্টা গুণ ৮ ঘণ্টা, অর্থাৎ ০ দশমিক ০৭২ ইউনিট। ৩০ দিনে এর ব্যবহার দাঁড়াবে মাত্র ২ দশমিক ১৬ ইউনিটে। অর্থাৎ এই নির্দিষ্ট উদাহরণে মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পার্থক্য প্রায় ১২ দশমিক ২৪ ইউনিট।
তবে এই হিসাব তখনই অর্থবহ হবে, যখন ৯ ওয়াটের LED বাল্বটি ৬০ ওয়াটের পুরোনো বাল্বের কাছাকাছি প্রয়োজনীয় আলো দিতে পারে। তাই শুধু ‘৯ ওয়াট’ লেখা আছে দেখে বাল্ব কেনা উচিত নয়। কোন বাল্ব কত লুমেন আলো দেয়, সেটিও মিলিয়ে দেখা দরকার।
একটি বাসায় যদি এমন পাঁচটি ৬০ ওয়াটের বাল্ব প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে জ্বলে, তাহলে ৩০ দিনে পাঁচটি বাল্বের মোট ব্যবহার দাঁড়ায় প্রায় ৭২ ইউনিট। একই ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাঁচটি ৯ ওয়াটের LED ব্যবহার করলে খরচ হবে প্রায় ১০ দশমিক ৮ ইউনিট। অর্থাৎ একই সময় আলো জ্বালানোর ক্ষেত্রে এই উদাহরণে মাসে প্রায় ৬১ দশমিক ২ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
এই পার্থক্য থেকে সরাসরি নির্দিষ্ট টাকার সাশ্রয় হিসাব করা যাবে না। কারণ বিদ্যুৎ বিল নির্ভর করে গ্রাহকের মোট মাসিক ব্যবহার, প্রযোজ্য ট্যারিফের ধাপ এবং অন্যান্য চার্জের ওপর। একটি পরিবারের পাঁচটি বাল্বের ব্যবহার কমলেও একই সময়ে ফ্যান, ফ্রিজ, এসি, পানির পাম্প, গিজার বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র বেশি চললে মোট বিল খুব বেশি কম নাও হতে পারে।
এ কারণেই LED ব্যবহারের সুবিধা বোঝার সময় ‘পুরো বিদ্যুৎ বিল’ এবং ‘আলোর বিদ্যুৎ খরচ’—এই দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। একটি বাসার মোট বিলের একটি অংশ আসে আলোর ব্যবহার থেকে। LED সেই অংশের বিদ্যুৎ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে, কিন্তু অন্য যন্ত্রের বিদ্যুৎ ব্যবহার একই থাকলে পুরো বিল একই অনুপাতে কমবে না।
LED-এর আরেকটি সুবিধা হলো দীর্ঘস্থায়িত্ব। মানসম্মত LED সাধারণ ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের তুলনায় অনেক বেশি সময় ব্যবহার করা যায়। ফলে ঘন ঘন বাল্ব নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে নতুন বাল্ব কেনার প্রয়োজন কমে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যবহারকারীর মোট ব্যয় কমাতে সাহায্য করতে পারে।
LED তুলনামূলক কম তাপও উৎপন্ন করে। বিশেষ করে ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় আলো জ্বালানোর ক্ষেত্রে এটি একটি বাড়তি সুবিধা। গরমের সময়ে ঘরের ভেতরে কম তাপ উৎপন্ন হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর মাধ্যমে এসি ব্যবহারের বিদ্যুৎ বিল কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে ঘরের আকার, তাপমাত্রা, এসির দক্ষতা এবং ব্যবহারের সময়সহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
যেসব ঘরে দীর্ঘ সময় আলো জ্বালানো হয়, সেখানে পুরোনো বেশি ওয়াটের বাল্বের পরিবর্তে দক্ষ LED ব্যবহার করলে সাশ্রয়ের সুযোগ বেশি। বসার ঘর, রান্নাঘর, পড়ার ঘর, দোকান, অফিস, সিঁড়িঘর বা বারান্দার মতো জায়গায় প্রয়োজন অনুযায়ী LED বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে যেসব স্থানে খুব কম সময় আলো জ্বলে, সেখানে বাল্ব পরিবর্তন করলেও মোট আর্থিক সাশ্রয় তুলনামূলক কম হতে পারে।
বাল্ব কেনার সময় আরও কিছু বিষয় খেয়াল করা দরকার। প্রথমত প্রয়োজনীয় উজ্জ্বলতা নির্ধারণ করে লুমেন দেখা উচিত। এরপর বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য ওয়াট, আলো কী ধরনের হবে তা বোঝার জন্য রঙের তাপমাত্রা এবং পণ্যের মান ও ওয়ারেন্টি বিবেচনা করা ভালো। ডিমার বা বিশেষ ধরনের লাইটিং কন্ট্রোল ব্যবহার করা হলে LED বাল্বটি সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানসম্মত পণ্য নির্বাচন। খুব কম দামের নিম্নমানের LED শুরুতে সাশ্রয়ী মনে হলেও দ্রুত নষ্ট হলে বারবার বাল্ব পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত খরচ বেড়ে যেতে পারে। তাই শুধু কম ওয়াট বা কম দাম নয়, বাল্বের আলোর মান, স্থায়িত্ব ও প্রস্তুতকারকের তথ্যও বিবেচনায় রাখা উচিত।
তবে LED ব্যবহার করলেই বিদ্যুৎ অপচয় বন্ধ হবে না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় লাইট বন্ধ করা, দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উজ্জ্বলতার বাল্ব ব্যবহার না করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ফ্যান, এসি, ফ্রিজ, পানির পাম্প ও অন্যান্য বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করলে মোট বিদ্যুৎ বিল কমানোর ক্ষেত্রে আরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, LED বাল্ব ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিল কমানো সম্ভব এবং পুরোনো ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের তুলনায় এর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সক্ষমতা অনেক বেশি। তবে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম শক্তি ব্যবহারের তথ্যকে পুরো বাসার বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না। সাশ্রয় নির্ভর করবে কতগুলো বাল্ব, কত ওয়াটের বাল্ব, প্রতিদিন কত ঘণ্টা ব্যবহার এবং আগে কী ধরনের বাল্ব ব্যবহার করা হচ্ছিল তার ওপর। তাই বিদ্যুৎ খরচ কমাতে চাইলে প্রয়োজনীয় লুমেন অনুযায়ী মানসম্মত LED বেছে নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ রাখা এবং একই সঙ্গে অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাই বেশি কার্যকর পদ্ধতি।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!