বড় ধরনের ভূমিকম্পে কোনো ফায়ার স্টেশন বা সদর দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যাতে উদ্ধার তৎপরতা থেমে না যায়, সে লক্ষ্যে জনবল, উদ্ধার সরঞ্জাম ও কমান্ড কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এর অংশ হিসেবে ঢাকা ও আশপাশের ৪১টি পয়েন্টে উদ্ধার সরঞ্জাম ছড়িয়ে দেওয়া, পূর্বাচলে বিশেষ রেসকিউ টিম মোতায়েন এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে পৃথক বিশেষ রেসকিউ টিম গঠন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ঢাকার আশপাশের ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে জরুরি প্রয়োজনে রাজধানীতে সহায়তার জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। বড় ভূমিকম্পের পর একসঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন হতে পারে—এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) বলেন, বড় ধরনের ভূমিকম্পে একই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের জনবল, উদ্ধার সরঞ্জাম ও কমান্ড ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পসহ যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য কমান্ড ব্যবস্থা সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরান ঢাকার পুরোনো সদর দপ্তর ভবন ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যাতে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া যায়, সে জন্য দুজন পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কমান্ড কর্মকর্তাদের মিরপুরে অফিস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সদর দপ্তরের মিডিয়া উইংয়ের মূল অংশও মিরপুরে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এ ছাড়া মিরপুর-১০-এর ট্রেনিং কমপ্লেক্সের কার্যক্রম পূর্বাচলের নতুন মাল্টিপারপাস ট্রেনিং কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পুরান ঢাকার সদর দপ্তর ভবনের ঝুঁকি বিবেচনায় মিরপুরে ভূমিকম্প প্রতিরোধক বহুতল সদর দপ্তর ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি—জাইকার সহযোগিতায় মিরপুর-১০ এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনটিতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘বেজ আইসোলেশন প্রযুক্তি’ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটি ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও ভেঙে পড়বে না। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ২০২৮ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ফায়ার সার্ভিসের পুরো অধিদপ্তর সেখানে স্থানান্তর করা হবে।
ভূমিকম্পে সদর দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে থাকা বিপুল পরিমাণ উদ্ধার সরঞ্জামও আটকে পড়তে পারে। এতে উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ঝুঁকি কমাতে ঢাকা ও এর আশপাশের ৪১টি পয়েন্টে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম ভাগ করে রাখা হয়েছে। কোনো একটি ফায়ার স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কাছাকাছি অন্য স্টেশন থেকে এসব সরঞ্জাম এনে উদ্ধারকাজ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বড় দুর্যোগে স্থানীয় ফায়ার স্টেশনের জনবল পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। এ জন্য স্পেশাল রেসকিউ টিম বা এসআরটি গঠন করা হয়েছে। পূর্বাচলে ৫০ থেকে ৬০ সদস্যের একটি বিশেষ রেসকিউ টিম রাখা হয়েছে। দুর্যোগের পর এই দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
একইভাবে বিভাগীয় শহরগুলোর বিভিন্ন ফায়ার স্টেশন থেকে জনবল নিয়ে প্রতিটি বিভাগীয় সদর দপ্তরে ২০ সদস্যের করে এসআরটি রাখা হয়েছে। এসব দলের সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে ধসে পড়া ভবনে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে পারেন।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে বড় ধরনের ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে বিভাগীয় শহরের বাইরে ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে রাজধানীকে সহায়তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মহানগরের কোনো স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা স্থানীয় জনবল দিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হলে এসব স্টেশন থেকে জনবল ও সরঞ্জাম এনে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেলে হেলিকপ্টারে উদ্ধার সরঞ্জাম ও রেসকিউ টিম স্থানান্তরের বিষয়েও বিমান বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয়েও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ অধিদপ্তরের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক বৈঠক হয়েছে। বড় ভূমিকম্প ও মেগা ডিজাস্টারে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট ও সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ে এসব বৈঠকে আলোচনা হয়েছে এবং কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
বড় ভূমিকম্পের সময় ওয়্যারলেস কভারেজ ও মোবাইল টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফায়ার সার্ভিসের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আরাব) সহায়তায় গত আগস্টে দেশব্যাপী কমিউনিকেশন এক্সারসাইজ করা হয়েছে। মহড়ায় বেতার, মোবাইল ও ল্যান্ডফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে বিভিন্ন ফায়ার স্টেশনের মধ্যে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার অনুশীলন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বাসসকে বলেন, বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এ ঝুঁকি বেশি। তাই বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। প্রশিক্ষিত জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, নিয়মিত মহড়া এবং সেগুলোর মনিটরিং ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বড় ভূমিকম্পের পর একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে বিপর্যয় মোকাবিলা করাই ফায়ার সার্ভিসের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ভবনধস, মানুষের আটকে পড়া, গ্যাসলাইন থেকে অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তিনি বলেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সরু সড়ক, যানজট, অবৈধ পার্কিং ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারী গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের স্থিতিশীলতা যাচাই না করে সেখানে প্রবেশ করাও উদ্ধারকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন, আটকে পড়াদের শনাক্তকরণ, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি এখনো ঝড়ের মতো উন্নত না হওয়ায় প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতি কতটা হবে তা আগে থেকে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না হলেও, উদ্ধার সক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জরুরি সেবা চালু রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!