ক্ষমতায় আসার পর দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল, হামলা, ভাঙচুর ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএনপি। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দলীয় কমিটি বিলুপ্ত, নেতাদের বহিষ্কার এবং একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা সামনে এসেছে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর। গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটির সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের নাম আলোচনায় আসার পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও গুরুত্ব পায়। পরে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নামও আলোচনায় আসে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১ অক্টোবর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তাঁর পদত্যাগপত্রে তিনি সচেতনভাবে ও স্বেচ্ছায় সংসদ সদস্য পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তী সময়ে সংসদ সচিবালয় সংরক্ষিত নারী আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রের বরাতে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পদত্যাগের সিদ্ধান্তের আগে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনাটির তদন্ত চলছে এবং তদন্তে যার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সাম্প্রতিক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাগুলো নিয়ে সরকারের দুঃখ ও বিব্রত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো নাগরিকের স্থাপনা ভাঙচুর বা হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া ও ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশার নাম এসেছে। তাঁদের ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব সম্পৃক্ততার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

রাড্ডা ঘটনার পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে বিএনপির সাংগঠনিক পদক্ষেপও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কমিটি দ্রুত ঘোষণা করার কথা বলা হলেও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। যুবদলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কারণেও কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

একই সময় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ১৪ নেতাকে বহিষ্কারের তথ্যও প্রকাশ্যে আসে। তাঁদের মধ্যে বিএনপির তিন নেতাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব ধরনের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে অনৈতিক কার্যকলাপ ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এর আগে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর দর্শনা পৌর যুবদলের সদস্য মো. রাকিবুল হাসান ব্রাইটকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পুলিশ ওই ঘটনায় তাঁকে ও ছাত্রদলের আরেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছিল। পরে যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের অভিযোগে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ব্রাইটকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়। একই ঘটনায় ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে মামলা করার তথ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

নারায়ণগঞ্জেও দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। ২১ জুন বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে এবং জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে চাঁদাবাজির অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়। পুলিশ জানিয়েছিল, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে যুবদল থেকেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।

এ ধরনের ধারাবাহিক ঘটনা রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও সরকারের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে কোনো অপরাধের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নাম যুক্ত হলে তদন্তের পাশাপাশি দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও জনআলোচনায় আসে। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, অপরাধের সঙ্গে যার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএনপির পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত স্বার্থে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক বা সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাম্প্রতিক কমিটি বিলুপ্ত ও বহিষ্কারের ঘটনাগুলো সেই সাংগঠনিক অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে অভিযোগ ওঠা আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে যেসব ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার বা দলীয় বহিষ্কার হয়েছে, সেগুলোর চূড়ান্ত দায় নির্ধারণে আইনগত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতায় এখন বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে অভিযোগ যাচাই, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে কী ধরনের আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটিই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সরকারের জন্যও চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!