রাজধানীর বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক দোকানে এক, দুই ও পাঁচ লিটারের বোতলজাত তেল মিলছে না। এর প্রভাব পড়েছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের বাজারেও। গত এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে নতুন করে বেড়েছে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম। তবে ব্রয়লার মুরগি ও বিভিন্ন ধরনের মাছের দামও আগের মতোই চড়া রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, পলাশী বাজার ও কল্যাণপুর নতুন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, কোম্পানিগুলো আগের তুলনায় কম পরিমাণে বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে ছাড়ছে। ফলে ডিলার ও সরবরাহকারীদের কাছ থেকেও প্রয়োজনের তুলনায় কম তেল পাচ্ছেন তারা। ডিলারদের কাছ থেকে তারা জানতে পারছেন, কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ায় সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, চাহিদা অনুযায়ী এক, দুই ও পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের অন্তত ছয়টি দোকানে গিয়ে প্রতিটিতে মাত্র চার-পাঁচটি করে সয়াবিন তেলের বোতল পাওয়া গেছে। কোনো দোকানে এক লিটারের বোতল নেই, আবার কোনো দোকানে দুই লিটারের বোতলও পাওয়া যাচ্ছে না।
বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। সরবরাহ কম থাকায় কোনো কোনো বিক্রেতা দোকানের সামনে সব তেল না রেখে কিছু বোতল আলাদা করে রাখছেন।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মুদি বিক্রেতা ইমান আলী বলেন, তার দৈনিক প্রায় ১০ কার্টন সয়াবিন তেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিলারের কাছ থেকে পেয়েছেন চার কার্টন। নিয়মিত ক্রেতারা চাইলে দিতে হয় বলে কিছু বোতল আলাদা করে সংরক্ষণ করছেন বলে জানান তিনি।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে গেলে সাধারণত খোলা তেলের চাহিদা বাড়ে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে লিটার ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায় উঠেছে। খোলা পাম তেলের দামও প্রায় শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা হয়েছে। ফলে দুই ধরনের খোলা তেলের দাম লিটারে প্রায় ২ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে।
চলতি বছর এর আগেও কয়েক দফা বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছিল। ফেব্রুয়ারির দিকে সংকট শুরুর পর এপ্রিলের শেষ দিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করা হয়। জুলাইয়ের দিকে আবার সরবরাহে সংকট দেখা দেয়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর লিটারে আরও ৫ টাকা বাড়িয়ে দাম ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এখন আবার সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ায় বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের দাম আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। এ বিষয়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যসচিবকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভেজিটেবল ফ্যাট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
তবে বুধবার সিলেটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, ব্যবসায়ীরা ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর দাবি জানালেও সরকার যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে। যাচাইয়ের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হবে না বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে গত এক সপ্তাহে ফার্মের মুরগির ডিমের দামও বেড়েছে। ডজনপ্রতি প্রায় ১০ টাকা বেড়ে এখন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। পাড়া-মহল্লার মুদিদোকানে এক হালি ডিম কিনতে গুনতে হচ্ছে ৫৫ টাকা। যারা এক বা দুটি করে ডিম কেনেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রতিটি ডিমের দাম পড়ছে প্রায় ১৫ টাকা।
ব্রয়লার মুরগির দামও বেশ কিছুদিন ধরে কমেনি। বাজারে প্রায় দুই মাস ধরে ব্রয়লার মুরগি কেজি ২০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ডিম, মুরগি ও মাছের বাড়তি দামে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। রাজধানীর শেখেরটেক এলাকার নিরাপত্তারক্ষী আনসার হোসেন বলেন, তার আয় সীমিত। সেই আয় দিয়ে ব্রয়লার মুরগি ও ডিম কিনে খেতে পারেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে ব্রয়লার মুরগির দাম কমেনি, এর মধ্যে ডিমের দামও ডজনপ্রতি ১৬০ টাকা হয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে রাজধানীর বাজারে একদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট, অন্যদিকে ডিম, মুরগি ও মাছের চড়া দাম—দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছেন ক্রেতারা। বিশেষ করে সীমিত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ব্যয় আরও বেড়েছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!