কালো ধোঁয়া ছেড়ে চলা ট্রেনের যুগ পেরিয়ে বৈদ্যুতিক রেলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ও জয়দেবপুর পর্যন্ত রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় পৌনে চার হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রেলপথে যুক্ত হবে ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা ও পাওয়ার সাব-স্টেশন। লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে এই রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর অবকাঠামো তৈরি করা।
রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রকল্পটি শুধু একটি নির্দিষ্ট রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নয়; বরং ভবিষ্যতে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরসহ দেশের অন্যান্য রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন সম্প্রসারণের ভিত্তি হিসেবে এটি কাজ করবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় ১৬ সেট রোলিং স্টক কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি সেটের সঙ্গে ন্যূনতম ছয়টি কোচ সংযুক্ত থাকবে। ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন চালু করা গেলে রেলওয়ের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রেলওয়ে সূত্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুরের পর ধাপে ধাপে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে সম্প্রসারণ করা হবে। এ লক্ষ্যে টঙ্গী-আখাউড়া ৯৭ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করেছে রেলওয়ে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০৩২ সাল পর্যন্ত নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে লাকসাম-চট্টগ্রাম ১৩১ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরের জন্য ১৬ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকার একটি ডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছে, যা একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। নতুন লাইন নির্মাণের সময়ই এই অংশে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন চালুর অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থাও স্থাপন করা হবে।
ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, ২০৩২-৩৩ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট করিডোরে ব্রডগেজে রূপান্তরের কাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে। ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনের কাজও রেলপথের উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে শুরু করা হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩৩-৩৪ সালের মধ্যে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বৈদ্যুতিক ট্রেনে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইতোমধ্যে আখাউড়া-লাকসাম রেলপথে নতুন ডাবল লাইন চালু হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-টঙ্গী রেলপথেও অতিরিক্ত ট্র্যাক নির্মাণের কাজ চলছে। তবে বৈদ্যুতিক ও দ্রুতগতির ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে অবকাঠামোর পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুলন্ত ক্যাটেনারি তার স্থাপন এবং রেলপথের লেভেল ক্রসিংগুলোতে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা বড় চ্যালেঞ্জ। এসব অবকাঠামো যথাযথভাবে প্রস্তুত না হলে দ্রুতগতির ট্রেন পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, যে ৫২ কিলোমিটার রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালানোর কথা বলা হচ্ছে, সেই রুটের জন্য যে রোলিং স্টকের কথা বলা হচ্ছে, তা দূরপাল্লার যাত্রার উপযোগী নয়। ফলে রোলিং স্টকের প্রয়োজনীয়তা ও এর স্পেসিফিকেশন কী হবে, সে বিষয়ে এখনই স্বচ্ছ ধারণা ও পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
রেলওয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ অংশকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ শেষ হলে ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক ট্রেনের সেবার আওতায় পর্যটন শহর কক্সবাজারকেও যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
ফলে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুরে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর উদ্যোগকে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় পরিবর্তনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখছে রেলওয়ে। প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকের শুরুতেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত বৈদ্যুতিক রেল যোগাযোগের একটি নতুন নেটওয়ার্ক তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!