একটি নোটিফিকেশন এলেই ফোনের দিকে হাত বাড়ানো, লাইক বা নতুন বার্তার অপেক্ষায় বারবার স্ক্রিন দেখা—কিশোর-কিশোরীদের দৈনন্দিন জীবনে এই আচরণ এখন খুব পরিচিত। কিন্তু বেড়ে ওঠার সময় মস্তিষ্কের ওপর স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই অভ্যাসের প্রভাব কতটা, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো আলোচনা চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক জে জিড ১৯৯১ সাল থেকে মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা করছেন। ১৯৯৯ সালে ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত তাঁর একটি গবেষণায় ১৪৫ জন সুস্থ অংশগ্রহণকারীর ২৪৩টি এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্কের গঠন কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে।

গবেষণায় দেখা যায়, বয়ঃসন্ধির ঠিক আগের সময়ে মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থ বা গ্রে ম্যাটারের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর শুরু হয় ‘সিন্যাপটিক প্রুনিং’ নামের একটি প্রক্রিয়া। এ সময় কম ব্যবহৃত স্নায়ু সংযোগগুলো ধীরে ধীরে ছাঁটাই হয়ে যায়। এর ফলে প্রয়োজনীয় সংযোগগুলো আরও কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ পায়।

মস্তিষ্কের এই পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্ত নেওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা এবং তাৎক্ষণিক প্রলোভন নিয়ন্ত্রণের মতো কাজের সঙ্গে যুক্ত এই অংশটি মস্তিষ্কের তুলনামূলক দেরিতে পরিণত হওয়া অঞ্চলগুলোর একটি। এর পূর্ণাঙ্গ পরিণতি আসতে সাধারণত মধ্য-বিশের কোঠা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

মনোবিজ্ঞানী লরেন্স স্টাইনবার্গ ২০০৮ সালে কিশোর বয়সের এই পরিস্থিতিকে ‘ম্যাচুরিটি গ্যাপ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর আলোচনায় দেখা যায়, কিশোরদের মস্তিষ্কের পুরস্কার-সন্ধানী অংশ, বিশেষ করে লিম্বিক সিস্টেমের নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেন্স, নতুন অভিজ্ঞতা ও সামাজিক স্বীকৃতির প্রতি তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল থাকে। অন্যদিকে এসব তাড়না নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স তখনো পুরোপুরি পরিণত হয়ে ওঠেনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক, কমেন্ট ও নোটিফিকেশনের ব্যবস্থার সঙ্গে এই বিষয়টির একটি সম্পর্কের কথা গবেষণায় উঠে এসেছে। ব্যবহারকারী কখন পরবর্তী লাইক বা নোটিফিকেশন পাবেন, তা আগে থেকে জানা যায় না। এই অনিশ্চিত পুরস্কারব্যবস্থা মানুষকে বারবার ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে যেতে উৎসাহিত করতে পারে। কিশোরদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বিকাশগত অবস্থার কারণে এই টান সামলানো আরও কঠিন হতে পারে বলে গবেষণাগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে একটি বিস্তারিত সতর্কবার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে বলা হয়, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রায় ৯৫ শতাংশ কোনো না কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। তাদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি জানিয়েছে, তারা প্রায় সবসময় এসব প্ল্যাটফর্মে থাকে।

২০২১ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গড়ে দিনে সাড়ে তিন ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটায়। ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৬ হাজার ৫৯৫ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ পাওয়া যায়।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার সম্পর্ক থাকলেই সেটিকে সরাসরি কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। এ জায়গায় ভিন্ন ধরনের গবেষণার ফলও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ লুকা ব্রাগিয়েরি, রো’ই লেভি ও আলেক্সেই মাকারিন ২০২২ সালে ‘আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ফেসবুক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধাপে ধাপে চালু হওয়ার বিষয়টি কাজে লাগান। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, যেসব ক্যাম্পাসে ফেসবুক আগে চালু হয়েছিল, সেখানকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছিল, যেসব ক্যাম্পাসে তখনো ফেসবুক চালু হয়নি তাদের তুলনায়।

অন্যদিকে ২০১৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যামি অরবেন ও অ্যান্ড্রু প্রজিবিলস্কি ‘নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার’ সাময়িকীতে ভিন্ন একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। তিনটি বড় ডেটাসেট থেকে মোট ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৮ জনের তথ্য নিয়ে তাঁরা ‘স্পেসিফিকেশন কার্ভ অ্যানালাইসিস’ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার ও কিশোর-কিশোরীদের সুস্থতার মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও এর প্রভাব ছিল খুবই ছোট। তাঁদের হিসাবে, এটি সুস্থতার তারতম্যের সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক চার শতাংশ ব্যাখ্যা করতে পারে।

ফলে গবেষণাগুলোর ফলাফলকে এক কথায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। একটি গবেষণা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্ভাব্য কার্যকারণ প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়, অন্যটি সামগ্রিকভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে কিশোরদের সুস্থতার সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে দেখায়। এ থেকে গবেষকদের মধ্যে এমন প্রশ্নও রয়েছে যে, শুধু কতক্ষণ ব্যবহার করা হচ্ছে তা নয়, কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কোন বয়সে ব্যবহার শুরু হচ্ছে—সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

২০২৪ সালে মনোবিজ্ঞানী জনাথন হাইটের ‘দ্য অ্যাংজাইটি জেনারেশন’ বই প্রকাশের পর বিষয়টি আরও ব্যাপক আলোচনায় আসে। বইটিতে ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে স্মার্টফোনের বিস্তার কিশোরদের শৈশবকে কীভাবে বদলে দিয়েছে, তার একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে অ্যামি অরবেনসহ কিছু গবেষক হাইটের উপস্থাপনায় সহসম্পর্ককে কার্যকারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন। এ নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিতর্ক এখনো চলছে।

উদ্বেগের কারণে বিভিন্ন দেশও নীতিগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। পরে আইন প্রয়োগ নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে আসে। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের প্রায় ৮৫ শতাংশ এখনো বিভিন্ন উপায়ে এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে।

২০২৬ সালের জুনে অস্ট্রেলিয়া আইন লঙ্ঘনকারী প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ ৪৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ৯৯ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার করে। ডেনমার্কও ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য একই ধরনের বিধিনিষেধের বিষয়ে সর্বদলীয় ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মালয়েশিয়াও ১৬ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়ে এগোচ্ছে।

এসব উদ্যোগের পাশাপাশি গবেষণার সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঠিক কতটা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে, আর কতটা প্রভাব পড়ছে পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি বা অন্যান্য কারণে—এ বিষয়ে বিজ্ঞান এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

তবে মস্তিষ্কের বিকাশের একটি বিষয় নিয়ে গবেষণায় তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার ধারণা রয়েছে। কিশোর বয়সে পুরস্কার-সন্ধানী মস্তিষ্কের অংশ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স একই গতিতে পরিণত হয় না। তাই এমন একটি সময়ে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা যদি বারবার নতুন পুরস্কার, লাইক ও নোটিফিকেশনের দিকে মনোযোগ টেনে নেয়, তাহলে এর প্রভাব কী—সেটি নিয়ে গবেষণা ও বিতর্ক আরও চলবে।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু কিশোররা দিনে কত ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করছে, তা নয়। তারা কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, কেন দেখছে, কখন ব্যবহার করছে এবং সেই ব্যবহারের কারণে ঘুম, পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনে কী পরিবর্তন হচ্ছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

লেখক: গবেষক ও মেশিন লার্নিং বিজ্ঞানী, ট্রাস্টওয়ার্দি এআই
সূত্র: নেচার নিউরোসায়েন্স, আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউ ও নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!