ভয় মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। হঠাৎ কোনো বিপদের আশঙ্কা, দুর্ঘটনার ভয়, শত্রুর ভয়, অনিশ্চয়তা কিংবা নিজের বা পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে মানুষের মন অস্থির হয়ে যেতে পারে। ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ার পরিবর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে, তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে শিক্ষা দিয়েছে। কুরআন ও হাদিসে ভয় ও বিপদের সময় আল্লাহকে স্মরণ করার বিভিন্ন দৃষ্টান্ত রয়েছে।
ভয় বা বিপদের আশঙ্কার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা। কুরআনে এমন একটি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যখন কিছু মানুষ মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে বলেছিল যে তাদের বিরুদ্ধে বড় একটি বাহিনী প্রস্তুত হয়েছে। তখন মুমিনদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তারা বলেছিল,
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
উচ্চারণ: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল।
অর্থ: আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক বা অভিভাবক।
সূরা আলে ইমরানের ১৭৩ নম্বর আয়াতে এই বক্তব্য এসেছে। সহিহ বুখারির বর্ণনায় ইবনে আব্বাস (রা.) জানিয়েছেন, ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপ করার সময় এবং পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবিরা ভয় দেখানো হলে এই বাক্য বলা হয়েছিল।
তাই কোনো বিপদের আশঙ্কা হলে একজন মুসলমান নিজের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আন্তরিকভাবে বলতে পারেন, হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল। তবে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়লেই নিশ্চিতভাবে বিপদ দূর হবে—এমন দাবি করা ঠিক নয়। বরং এটি আল্লাহর ওপর নির্ভরতা, তাঁর সাহায্যের প্রতি আস্থা এবং নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জিকির।
ভয় ও বিপদের সময় দোয়ার পাশাপাশি নামাজের গুরুত্বও রয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে এমনকি যুদ্ধ ও সরাসরি বিপদের মধ্যেও রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবিরা নামাজ আদায় করেছেন। সহিহ মুসলিমে ভয় বা বিপদের পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবিদের নিয়ে নামাজ আদায়ের বর্ণনা রয়েছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হলে কীভাবে নামাজ আদায় করতে হবে, সে বিষয়েও ইসলামে বিশেষ বিধান রয়েছে।
এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ভয় মানুষের ইবাদত থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ নয়। বরং ভয় ও বিপদের সময় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার শিক্ষা রয়েছে। অবশ্য বাস্তব বিপদের ক্ষেত্রে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া, প্রয়োজনীয় সাহায্য নেওয়া এবং যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করাও ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাওয়াক্কুল মানে ঝুঁকি উপেক্ষা করা নয়; বরং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পর আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
ভয় বা বিপদের আশঙ্কার সময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। নামাজের শেষ বৈঠকে রাসুলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন বিপদ ও পরীক্ষার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে শিক্ষা দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি দোয়ায় জাহান্নামের শাস্তি, কবরের আজাব, জীবন ও মৃত্যুর পরীক্ষা এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
দোয়াটি হলো,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন আজাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন আজাবিল কবর, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসিহিদ্দাজ্জাল।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে জাহান্নামের শাস্তি থেকে, কবরের শাস্তি থেকে, জীবন ও মৃত্যুর পরীক্ষা থেকে এবং মসিহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।
ভয়ের মুহূর্তে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে মনকে আল্লাহর স্মরণে স্থির রাখার চেষ্টা করা যায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট আয়াত বা জিকির সম্পর্কে সহিহ দলিল ছাড়া এমন দাবি করা উচিত নয় যে সেটি পড়লেই নিশ্চিতভাবে নির্দিষ্ট ধরনের বিপদ দূর হয়ে যাবে। ইসলামী আমলের ক্ষেত্রে কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ভয় যদি বাস্তব কোনো বিপদের কারণে হয়, তাহলে দোয়ার পাশাপাশি বাস্তব ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। যেমন আগুন লাগলে নিরাপদ স্থানে যাওয়া, দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলে সতর্ক হওয়া, অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসা নেওয়া কিংবা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি থাকলে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া। আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ নিজের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নয়।
একজন মুমিনের জন্য ভয় ও বিপদের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্কের মধ্যে আল্লাহকে ভুলে না যাওয়া। নিজের অন্তরকে মনে করিয়ে দেওয়া যে ক্ষমতা ও সাহায্যের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। এরপর দোয়া, নামাজ, জিকির এবং প্রয়োজনীয় বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
তাই হঠাৎ ভয় পেলে বা কোনো বিপদের আশঙ্কা হলে “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল” বলে আল্লাহর ওপর ভরসা করা যেতে পারে। পাশাপাশি তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া, নামাজ আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভয় যত বড়ই মনে হোক, একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর সাহায্যের দরজা সবসময়ই উন্মুক্ত।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!