হৃদরোগ প্রতিরোধে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা নয়, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পর্যায় থেকে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে বিশ্ব হার্ট দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত গণমুখী সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এ সেমিনারের আয়োজন করে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের জন্য আরও সহজলভ্য করতে সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে কাজ করছে। চিকিৎসক নিয়োগসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে চিকিৎসা খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময়ে যেসব মেশিন আনা হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলো ব্যবহার উপযোগী ছিল না এবং অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও তা মানুষের কাজে আসেনি।
তিনি জানান, এবারই প্রথম স্বাস্থ্যখাতকে গুরুত্ব দিয়ে সর্বোচ্চ বাজেট দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ থেকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
সাধারণ মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ১০টি করে এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ৫০টি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর চাপ কিছুটা কমবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে মানুষকে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকার স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো তৈরির নামে অর্থ অপচয় করেছে। বর্তমান সরকার অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশব্যাপী নার্স নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং বর্তমানে পুলিশ ভেরিফিকেশন চলছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিবেশী দেশ প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশও নতুন করে বাঁধ দিয়ে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করছে। তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে এসব পানি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ফজিলা-তুন-নেসা মালিক বলেন, বিশ্বে প্রতিবছর ২ কোটি ৫ লাখের বেশি মানুষ কার্ডিওভাসকুলার রোগে মারা যান। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব রোগের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন গবেষণা, জনসচেতনতা এবং অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে সারা বছর হৃদরোগ প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধ শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতার ওপর নির্ভর করে না। এ জন্য কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে তিনি তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৬-এর বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী লবণ গ্রহণ সীমিত করা।
অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরীর মতে, এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে শুরু থেকেই ঝুঁকির বিষয়গুলো শনাক্ত করা জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং তামাক ব্যবহারের মতো ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হৃদরোগের প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য স্বাস্থ্যশিক্ষা ও জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বিনা মূল্যে হৃদরোগ নির্ণয় ক্যাম্প, সচেতনতামূলক পোস্টার ও লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। রাজধানীর বাইরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ৪৫টি অ্যাফিলিয়েটেড বডিও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করে।
এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এতে কয়েক শতাধিক মানুষ অংশ নেন।
তথ্যসূত্র: এসইউজে/এসএনআর
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!