বাংলা কিউআরভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেন আরও বিস্তৃত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন শুধু দোকান বা প্রতিষ্ঠানে পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ নয়, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রেও বাংলা কিউআর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মার্চেন্টদের জন্য লেনদেনের খরচ কমানো, অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে হিসাবে জমা এবং নতুন প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকেরা নিজেদের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে সারা দেশে প্রায় ৩৯ লাখ মার্চেন্টের কাছে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন। ফলে দেশের দৈনন্দিন কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবার মূল্য পরিশোধে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত জুনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ বাংলা কিউআর লেনদেন হয়েছিল। এসব লেনদেনের দৈনিক গড় অর্থমূল্য ছিল ২৮ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বাংলা কিউআর লেনদেন হচ্ছে। এসব লেনদেনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা লেনদেন হচ্ছে।

অর্থাৎ, গত ১ জুলাই থেকে ৯০ দিনের ব্যবধানে বাংলা কিউআর লেনদেনের দৈনিক গড় সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে। একই সময়ে লেনদেনের গড় অর্থমূল্য বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে এই প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলা কিউআর ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে গত ১ জুলাই থেকে নিজস্ব বা আলাদা কিউআর ব্যবস্থার পরিবর্তে বাংলা কিউআর ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা, প্রচার, মার্চেন্টদের খরচ এবং লেনদেনের কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, বাংলা কিউআর ব্যবহারের বিস্তার ঘটাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব খাতে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা আরও কমানো সম্ভব হতে পারে।

বাংলা কিউআর ব্যবস্থার সম্প্রসারণে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকরী কমিটি কাজ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্টিয়ারিং কমিটিও কাজ করছে। এসব কমিটি বাংলা কিউআর ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় নীতি ও কৌশল নির্ধারণে কাজ করছে।

মার্চেন্টদের বাংলা কিউআর ব্যবহারে আরও উৎসাহিত করতে ১ অক্টোবর থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন আসছে। ওই দিন থেকে কিউআরভিত্তিক লেনদেনের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টের হিসাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হচ্ছে।

বর্তমানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর মার্চেন্টের হিসাবে অর্থ জমা হতে সময় লাগতে পারে। নতুন ব্যবস্থায় পণ্য বা সেবার মূল্য বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পরিশোধ করার পর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর হিসাবে দ্রুত অর্থ জমা হবে। এতে ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন কমার পাশাপাশি বাংলা কিউআর ব্যবহারে আগ্রহ বাড়তে পারে।

একই দিন থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআরের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সর্বনিম্ন ১ শতাংশ এমডিআর বাতিল করা হবে। পাশাপাশি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর ফলে মার্চেন্ট পর্যায়ে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো মার্চেন্টদের বিনা খরচে অথবা নামমাত্র খরচে বাংলা কিউআর পেমেন্ট সেবা দিতে পারবে।

বাংলা কিউআর ব্যবহারে আরও আগ্রহ তৈরি করতে ১ অক্টোবর থেকে নতুন প্রণোদনা ব্যবস্থাও চালু করা হচ্ছে। জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ বা NPSB প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া বাংলা কিউআর লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণোদনা দেবে।

এই ব্যবস্থায় অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে লেনদেনের ০.১০ শতাংশ এবং ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে ০.২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হবে। এর ফলে বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং মার্চেন্ট পর্যায়ে এর ব্যবহার আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলা কিউআরের সম্প্রসারণে ব্যবসা বা প্রচলিত লেনদেন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা অমূলক বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনের পরিধি আরও সম্প্রসারিত হবে।

বিশেষ করে মার্চেন্ট পর্যায়ে লেনদেনের খরচ কমানো, দ্রুত অর্থ জমা, প্রণোদনা এবং ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি অর্থ পাঠানোর সুবিধা যুক্ত হলে বাংলা কিউআর একটি আরও বিস্তৃত ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এর মাধ্যমে ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন কেনাকাটায় কিউআরভিত্তিক লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

ফলে বাংলা কিউআর এখন শুধু দোকানে গিয়ে মোবাইল দিয়ে বিল পরিশোধের প্রযুক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি অর্থ স্থানান্তর, মার্চেন্ট পেমেন্ট এবং বিভিন্ন খাতের ডিজিটাল লেনদেনকে একই কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগের ফলে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় বাংলা কিউআরের ভূমিকা আরও বাড়তে পারে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!