একসময় ইন্টারনেট ব্যবহার মানেই ছিল ঘরে একটি নির্দিষ্ট লাইনের সংযোগ, মডেম বা রাউটারের সঙ্গে তারের সম্পর্ক। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক, ৪জি, ৫জি, ফিক্সড ওয়্যারলেস অ্যাক্সেস বা এফডব্লিউএ এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বিস্তারের কারণে ঘর, অফিস কিংবা চলার পথে ইন্টারনেট ব্যবহারে তারের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ কি আরও বেশি তারবিহীন হতে যাচ্ছে?

বর্তমানে স্মার্টফোনে মোবাইল ডেটা ব্যবহার করে সরাসরি ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওয়্যারলেস রাউটার ও ফিক্সড ওয়্যারলেস প্রযুক্তি। এসব ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল গ্রহণ করে রাউটারের মাধ্যমে ঘর বা অফিসের একাধিক ডিভাইসে ওয়াইফাই সংযোগ দেওয়া যায়। ফলে প্রচলিত কেবল টেনে ইন্টারনেট সংযোগ নেওয়ার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে।

বিশেষ করে ৫জি প্রযুক্তি এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করতে পারে। উচ্চগতির মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শুধু স্মার্টফোন নয়, বাসা ও অফিসের ব্রডব্যান্ড সংযোগের বিকল্প হিসেবেও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। ফিক্সড ওয়্যারলেস অ্যাক্সেসের ক্ষেত্রে গ্রাহকের বাড়িতে একটি নির্দিষ্ট ডিভাইস বসানো হয়, যা কাছাকাছি মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে সংযোগ নিয়ে সেটিকে ওয়াইফাই বা স্থানীয় নেটওয়ার্কে বিতরণ করে।

বাংলাদেশেও তারবিহীন ইন্টারনেটের এই প্রবণতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর মোবাইল নেটওয়ার্কনির্ভর ওয়াইফাই বা ব্রডব্যান্ডের বিকল্প সেবা নিয়ে আসছে। গ্রাহকদের জন্য এসব সেবার বড় সুবিধা হলো, নতুন করে দীর্ঘ কেবল টানার প্রয়োজন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শুধু নির্দিষ্ট রাউটার বা ডিভাইস ব্যবহার করেই বাসা কিংবা ছোট অফিসে ইন্টারনেট চালানো সম্ভব।

এর ফলে এমন জায়গাতেও ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যেখানে প্রচলিত ফাইবার বা কেবল অবকাঠামো পৌঁছানো কঠিন। প্রত্যন্ত এলাকা, নতুন আবাসিক এলাকা কিংবা অস্থায়ী স্থাপনায় ফিক্সড ওয়্যারলেস সংযোগ তুলনামূলক দ্রুত চালু করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে ফাইবার অপটিক বা অন্যান্য তারযুক্ত ইন্টারনেট পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। বরং তারযুক্ত ও তারবিহীন প্রযুক্তি পাশাপাশি থাকবে এবং ব্যবহারভেদে কোনটি বেশি কার্যকর হবে তা নির্ভর করবে অবস্থান, খরচ, গতি, স্থিতিশীলতা ও প্রয়োজনের ওপর।

ফাইবার অপটিক এখনো উচ্চগতির স্থির ইন্টারনেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বড় ডেটা সেন্টার, মোবাইল নেটওয়ার্কের ব্যাকহল, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ এবং বিপুল পরিমাণ ডেটা পরিবহনে ফাইবারের গুরুত্ব অনেক। অর্থাৎ ব্যবহারকারীর হাতে হয়তো তার থাকবে না, কিন্তু সেই ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট সংযোগের পেছনে থাকা বড় নেটওয়ার্কে ফাইবারের ভূমিকা থেকে যাবে।

তারবিহীন ইন্টারনেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্যাটেলাইট প্রযুক্তি। পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ফাইবার বা মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করা কঠিন, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষ করে দুর্গম দ্বীপ, পাহাড়ি এলাকা, সমুদ্রপথ কিংবা দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনে এ ধরনের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভবিষ্যতে স্যাটেলাইট, ৫জি ও পরবর্তী প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ওয়াইফাই প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করলে ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরন আরও বদলাতে পারে। ব্যবহারকারী হয়তো বুঝতেই পারবেন না তার ডিভাইস কোন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ডিভাইস বা নেটওয়ার্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবচেয়ে উপযুক্ত সংযোগ বেছে নেওয়ার ব্যবস্থাও আরও উন্নত হতে পারে।

তবে তারবিহীন ইন্টারনেটের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নেটওয়ার্কের সক্ষমতা, স্পেকট্রাম, টাওয়ারের ঘনত্ব, বিদ্যুৎ সরবরাহ, ডিভাইসের মান, ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং অবস্থান অনুযায়ী গতি ও স্থিতিশীলতার পার্থক্য তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চগতির ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক চালাতে অপারেটরদের অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ করতে হয়।

গ্রাহকের জন্য খরচও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু মাসিক ডাটা প্যাকেজের দাম নয়, রাউটার বা অন্যান্য ডিভাইসের দাম, নেটওয়ার্ক কভারেজ এবং ব্যবহারের সীমাবদ্ধতাও বিবেচনা করতে হয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিকে সবার জন্য একইভাবে সেরা সমাধান বলা যায় না।

তবু সামগ্রিক প্রবণতা বলছে, ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আরও বেশি তারবিহীন হওয়ার সম্ভাবনাই তৈরি হচ্ছে। ঘরে ফাইবার সংযোগ থাকলেও ব্যবহারকারীর ফোন, টেলিভিশন, ল্যাপটপ, ক্যামেরা ও অন্যান্য স্মার্ট ডিভাইস ইতিমধ্যে মূলত ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ফিক্সড ওয়্যারলেস, স্যাটেলাইট এবং উন্নত ওয়াইফাই প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে এই নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের ইন্টারনেট হয়তো পুরোপুরি তারবিহীন হবে না। বরং ব্যবহারকারীর চোখের সামনে থাকা তার কমে গিয়ে নেপথ্যের নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী ও তারনির্ভর হতে পারে। ঘরে ইন্টারনেট আসবে ওয়্যারলেসে, ডিভাইসগুলো যুক্ত থাকবে ওয়াইফাইয়ে, আর প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল বা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক সংযোগের বিকল্প তৈরি করবে। এই পরিবর্তনই আগামী দিনের ইন্টারনেট ব্যবহারের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হতে পারে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!