নওগাঁর সাপাহার উপজেলার হাপানিয়া কে এম ফাজিল মাদ্রাসায় চারটি পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ আলাউদ্দীন সিরাজীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী। অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসীর মধ্যে বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। এ নিয়ে মাদ্রাসার সামনে পাল্টাপাল্টি মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে অধ্যক্ষ আলাউদ্দীন সিরাজী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসাটিতে দুইজন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট—পদার্থ ও রসায়ন এবং দুইজন অফিস সহায়কসহ মোট চারটি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. কামরুল, দেলোয়ার, সারোয়ার ও বাবুল হোসেন।

অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের ৯ এপ্রিল পত্রিকায় চারটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তির পর চারটি পদের বিপরীতে মোট ৩৫ জন প্রার্থী আবেদন করেন। পরবর্তীতে ১৮ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

তবে অভিযোগকারীরা বলছেন, নিয়োগ পরীক্ষার একদিন আগে, অর্থাৎ ১৭ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষার সম্ভাব্য ফলাফল প্রকাশ করা হয়। পরদিন অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ঘোষিত ফলাফল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ওই সম্ভাব্য ফলাফলের সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাদের দাবি, পরীক্ষার আগেই ফলাফল প্রকাশের বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন।

এদিকে নিয়োগ পরীক্ষার প্রবেশপত্র ১৭ সেপ্টেম্বর বিতরণ করা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা শুরু হয় বেলা ১১টার দিকে। কয়েকজন পরীক্ষার্থীর অভিযোগ, পছন্দের প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না হওয়ায় পরীক্ষা বিলম্বিত করা হয়। তবে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দাবি, বিদ্যুৎ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হয়নি।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তুলে পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার দাবিতে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেন। কয়েকজন পরীক্ষার্থীও নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, চারটি পদে নিয়োগের জন্য মোট ৩৬ লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের চার প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে এই অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত নথি বা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

অভিযোগের সূত্র ধরে সম্প্রতি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আলাউদ্দীন সিরাজীর অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ভিডিওতে একজন ব্যক্তির হাতে টাকা দেখা গেলেও অধ্যক্ষের হাতে কোনো টাকা দেখা যায়নি বলে জানা গেছে। ভিডিওটির সময়, স্থান, প্রেক্ষাপট এবং অর্থ লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বাড়ে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সকালে। অভিযোগ রয়েছে, সেদিন মাদ্রাসার শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের একটি বৈঠক চলাকালে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল সেখানে প্রবেশ করে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এতে অধ্যক্ষ আলাউদ্দীন সিরাজী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, নিয়োগ পরীক্ষার দিন নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও মাদ্রাসার সভাপতি উপস্থিত ছিলেন না। এ বিষয়টিও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে তারা মনে করছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পরীক্ষার্থী বলেন, তারা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের আশঙ্কা করছেন। তাদের দাবি, চারটি পদে ৩৬ লাখ টাকার বিনিময়ে পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্তমান নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে স্বচ্ছ ও নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি জানান তারা।

তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন হাপানিয়া কে এম ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আলাউদ্দীন সিরাজী। তিনি বলেন, ১৬ সেপ্টেম্বর ডিজির প্রতিনিধির কাছ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে চিঠি পান। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবেশপত্র বিতরণ করা হয়।

পরীক্ষা দেরিতে শুরু হওয়ার বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, পরীক্ষার দিন বিদ্যুৎ না থাকায় সকাল ৯টায় পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে বেলা ১১টায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দিতে পরীক্ষা বিলম্বিত করার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

২৫ সেপ্টেম্বরের হামলার বিষয়ে অধ্যক্ষ আলাউদ্দীন সিরাজী বলেন, ম্যানেজিং কমিটির বৈঠক চলাকালে একদল লোক সেখানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে এবং তাকে মারধর করে। তিনি এ ঘটনায় নিজেকে আহত হওয়ার দাবি করেন।

অর্থ লেনদেনের ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আজিজার রহমানের ছেলে ওই নিয়োগ পরীক্ষার একজন প্রার্থী ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রার্থীর বাবা তাকে কিছু টাকা দিয়ে ছেলেকে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে তিনি সেই টাকা গ্রহণ করেননি বলে দাবি করেন।

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, মানববন্ধন এবং হামলার ঘটনায় বর্তমানে মাদ্রাসাটিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সম্ভাব্য ফলাফলের উৎস, নিয়োগ পরীক্ষার সময় পরিবর্তনের কারণ, নিয়োগ বোর্ডের উপস্থিতি এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা কিংবা অসত্যতা স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!