সবাই যে পথে হাঁটে, সেই পথ সবসময় নতুন ইতিহাস তৈরি করে না। ইতিহাস তৈরি হয় তখনই, যখন কেউ নিজের বিশ্বাস, আগ্রহ ও স্বপ্নকে অনুসরণ করে ভিন্ন এক পথ বেছে নেন। বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানী মোহাম্মদ উজ্জ্বল হোসেনের গল্পটিও যেন তেমনই এক যাত্রার প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশে ‘বায়োইনফরমেটিক্স’ শব্দটি যখনও অনেকের কাছে অপরিচিত, তখনই সরকারি পর্যায়ে এই নতুন গবেষণাক্ষেত্র নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন উজ্জ্বল হোসেন। দেশের বিজ্ঞান গবেষণা কাঠামোয় বায়োইনফরমেটিক্সের বিকাশে ভূমিকা রাখা এই বিজ্ঞানী এবার যাচ্ছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে পিএইচডি বা ডি.ফিল করবেন তিনি।

তবে অক্সফোর্ডে যাওয়ার পথটি উজ্জ্বলের জন্য সহজ ছিল না। মানিকগঞ্জের বেংরোয়া গ্রামের সাধারণ পরিবেশ থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর শিক্ষাজীবন। স্থানীয় পাকুটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ভর্তি হন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনায় গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে যায় আন্তর্জাতিক গবেষণার পরিসরে।

বর্তমানে উজ্জ্বল হোসেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির (এনআইবি) বায়োইনফরমেটিক্স বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশে বায়োইনফরমেটিক্স গবেষণার সূচনা ও বিকাশে তাঁর অবদান রয়েছে।

জিনোম বিশ্লেষণ, ব্যাকটেরিয়াল জিনোমিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন তিনি। দেশের সরকারি গবেষণা কাঠামোর সঙ্গে বায়োইনফরমেটিক্স গবেষণাকে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন।

২০২২ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন উজ্জ্বল। তাঁর থিসিস গবেষণা ছিল অক্সফোর্ডের খ্যাতনামা ওয়েলকাম সেন্টার ফর হিউম্যান জেনেটিক্সে। সেখানে অধ্যাপক মিলোসেভিচের তত্ত্বাবধানে গবেষণার সুযোগ পান তিনি। তাঁর গবেষণাসংশ্লিষ্ট দুই সুপারভাইজরের একজন ছিলেন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী।

গবেষণার পাশাপাশি দেশে বায়োইনফরমেটিক্সের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০২০ সালে প্রকাশ করেন ‘গবেষণায় বায়োইনফরমেটিক্স’ বইটি। বাংলা ভাষায় বায়োইনফরমেটিক্স বিষয়ে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

এ পর্যন্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে বায়োইনফরমেটিক্স, আর প্রোগ্রামিং ও পাইথন প্রোগ্রামিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও বিভিন্ন পেশাজীবীসহ কয়েকশ মানুষও তাঁর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

গবেষণাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন উজ্জ্বল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকংয়ে গবেষণা উপস্থাপন করেছেন তিনি। পাশাপাশি কর্মস্থল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির বিজ্ঞানীদের ভোটে জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কারও পেয়েছেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি তাঁর হাতে ছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব। তবে নিজের গবেষণার লক্ষ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পছন্দের ক্ষেত্র বিবেচনা করে তিনি অক্সফোর্ডকেই বেছে নেন।

তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। কারণ এর আগে ২০১৯ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অধ্যাপক স্যার পিটার জে. র‍্যাটক্লিফের গবেষণাগার থেকেও পিএইচডির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। অক্সিজেন সংবেদনের আণবিক প্রক্রিয়া আবিষ্কারের জন্য ওই বছর নোবেল পুরস্কার পান অধ্যাপক র‍্যাটক্লিফ।

বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর গবেষণাগারে কাজ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও উজ্জ্বল নিজের আগ্রহের ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেন। পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার পাশাপাশি জীববিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের প্রয়োগ নিয়েই কাজ করতে চেয়েছেন তিনি।

উজ্জ্বলের বিশ্বাস, ভবিষ্যতের জীববিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তি গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই নিজের গবেষণার জন্য এআইভিত্তিক বায়োইনফরমেটিক্সকে বেছে নিয়েছেন তিনি।

অক্সফোর্ডে তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় হবে জীবাণুর জিনোমিক্স, ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তন এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুরোধী ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা। এসব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গভীর শিক্ষণপ্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে কাজ করবেন তিনি।

এই গবেষণা অক্সফোর্ডের প্রায় ২০০ কোটি টাকা সমমূল্যের একটি বড় গবেষণা প্রকল্পের অংশ। এতে তিনটি মহাদেশের গবেষকদের মধ্যে সহযোগিতামূলক গবেষণা হবে বলে জানা গেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে উজ্জ্বল হোসেন জানান, অক্সফোর্ড থেকে গবেষণা শেষ করে দেশে ফিরে জাতীয় পর্যায়ে জিনোমিক তথ্য-অবকাঠামো গড়ে তুলতে চান তিনি। পাশাপাশি সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বায়োইনফরমেটিক্সের ব্যবহার প্রতিষ্ঠা করাও তাঁর লক্ষ্য।

নিজের এই যাত্রা সম্পর্কে উজ্জ্বল হোসেন বলেন, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর গবেষণাগারে সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। তবে যে পথে নিজের আগ্রহ ও বিশ্বাস থাকে, সেই পথেই মানুষ বড় অবদান রাখতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে শুধু নিজের গবেষণাই নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করতে চান তিনি।

মানিকগঞ্জের গ্রামের মেঠোপথ থেকে অক্সফোর্ডের ঐতিহ্যবাহী গবেষণাগার—মোহাম্মদ উজ্জ্বল হোসেনের এই যাত্রা বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!