প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন হয়েছে মাত্র চারবার। সর্বশেষ সমাবর্তন হয়েছিল ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার পর আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পঞ্চম সমাবর্তন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময় পরপর সমাবর্তন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কিন্তু সমাবর্তন নিয়মিত না হওয়ায় শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় মূল সনদপত্র হাতে পান না। সাময়িক সনদ দিয়ে চাকরি, উচ্চশিক্ষা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ চালিয়ে নিতে হলেও বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে মূল সনদের প্রয়োজন হলে তাদের জটিলতায় পড়তে হয়। ফলে সমাবর্তন শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্যাশার বিষয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠার প্রায় ১২ বছর পর ১৯৯৩ সালে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয়, ২০০২ সালে তৃতীয় এবং দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০১৮ সালে চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পঞ্চম সমাবর্তন হলে চতুর্থ ও পঞ্চম সমাবর্তনের মধ্যেও প্রায় আট বছরের ব্যবধান থাকবে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালের ২৭ এপ্রিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চ্যান্সেলর ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এতে সভাপতিত্ব করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকের বিভিন্ন ব্যাচ থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের স্নাতক, স্নাতকোত্তরসহ বিভিন্ন ডিগ্রির মূল সনদ দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদকও প্রদান করা হয়। প্রথম সমাবর্তনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ স্মারক প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও বিকাশ নিয়ে বিভিন্ন লেখা স্থান পায়।
এর ছয় বছর পর ১৯৯৯ সালের ৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় সমাবর্তন। এতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করেন। এ সময় আগের কয়েকটি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ডিগ্রির মূল সনদ দেওয়া হয়।
এরপর ২০০২ সালের ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় সমাবর্তন। এতে দ্বিতীয়বারের মতো খালেদা জিয়া, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে সভাপতিত্ব করেন। ওই অনুষ্ঠানে ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মূল সনদ এবং স্বর্ণপদক দেওয়া হয়েছিল।
তৃতীয় সমাবর্তনের পর আবারও দীর্ঘ অপেক্ষায় পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রায় ১৬ বছর পর ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ সমাবর্তন। এতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর আবদুল হামিদ সভাপতিত্ব করেন। সমাবর্তন বক্তা ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল।
চতুর্থ সমাবর্তনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মূল সনদ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানে ১ হাজার ৬৩৭ জন স্নাতক, ৭ হাজার ৪৮৮ জন স্নাতকোত্তর, ১৩৭ জন এমফিল এবং ১১০ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারীসহ মোট ৯ হাজার ৩৭২ জনকে মূল সনদ দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে মেধাতালিকার শীর্ষ ৮০ জন শিক্ষার্থীকে রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর পঞ্চম সমাবর্তনের ঘোষণায় তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের পর এ বিষয়ে নিশ্চিত করেন বলে জানানো হয়েছে।
তবে পঞ্চম সমাবর্তনের ঘোষণা নিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নিয়মিত সমাবর্তনের দাবি তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, চার বছর বা নির্দিষ্ট সময় পরপর সমাবর্তন আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করার পর তুলনামূলক দ্রুত মূল সনদ হাতে পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে দীর্ঘ অপেক্ষার সমস্যাও কমতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, দীর্ঘ সময় পর সমাবর্তনের আয়োজন হওয়ায় তারা খুশি। তবে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশার একটি হলো শিক্ষাজীবন শেষ করার পর দ্রুত মূল সনদ পাওয়া। তাঁর মতে, সমাবর্তনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ব্যবধানের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে নিয়মিত আয়োজনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, পঞ্চম সমাবর্তনের ঘোষণা আনন্দের হলেও সেশনজটের কারণে তাদের মতো অনেক শিক্ষার্থী এতে অংশ নিতে পারবেন না। বর্তমান ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা থাকলে ভবিষ্যতে তাদের আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। তাই চার বছর পরপর সমাবর্তন আয়োজনের একটি নিয়ম চালুর দাবি জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মিজানূর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্সে সমাবর্তন আয়োজনের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তবে সাধারণভাবে প্রতিবছর সমাবর্তন আয়োজনের রীতি রয়েছে। অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী সমাবর্তন হওয়ার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট, প্রশাসনিক জটিলতা ও অন্যান্য কারণে প্রতিবছর সমাবর্তন আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, সমাবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি, বিভিন্ন পরীক্ষা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং অন্যান্য বিষয়ও জড়িত থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের সময় ও সক্ষমতা অনুযায়ী সমাবর্তনের আয়োজন করে থাকে।
নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজনের বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, সমাবর্তন নিয়মিত হওয়াই স্বাভাবিক। তবে এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন, বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষা, বড় অঙ্কের অর্থ এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির মতো বিষয় জড়িত থাকে। এ কারণে চাইলেই যেকোনো সময় সমাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। নিয়মিত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
উপাচার্য আরও বলেন, পঞ্চম সমাবর্তনের পর তাঁর বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই আরেকটি সমাবর্তন আয়োজনের চেষ্টা করবেন।
ফলে ২০২৭ সালের পঞ্চম সমাবর্তন ঘিরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন উৎসাহ তৈরি হয়েছে, তেমনি সামনে এসেছে নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজনের দীর্ঘদিনের দাবি। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, সমাবর্তনের সময়ের ব্যবধান কমিয়ে এমন একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা তৈরি করা হবে, যাতে স্নাতক শেষ করার পর মূল সনদের জন্য তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!