যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বৈশ্বিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিনিয়োগের জন্য আস্থা, নীতির পূর্বানুমেয়তা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের উপযোগী পরিবেশ প্রয়োজন। এসব বিষয় নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে এবং বাংলাদেশের বার্তা হলো দেশটি ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত।
২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে জেপিমরগ্যান চেজের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রাতরাশ বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। ‘বাংলাদেশ কামস টু ওয়াল স্ট্রিট’ শিরোনামের এই আয়োজনে বৈশ্বিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ সম্ভাবনা, বাণিজ্য এবং আর্থিক খাতের বিভিন্ন সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী এই বৈঠকে অংশ নেন। ২১ সেপ্টেম্বর তিনি নিউইয়র্কে পৌঁছান এবং ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন।
বৈঠকে তারেক রহমান বলেন, রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে অর্থ বিনিয়োগের আগে স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসা পরিচালনার অনুকূল পরিবেশকে গুরুত্ব দেন। সরকারের লক্ষ্য এসব ক্ষেত্রে আস্থা তৈরি করা।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা তুলে ধরে বলেন, ১৮ কোটির বেশি জনসংখ্যা, তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান বাজার এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এতদিন বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক ও উৎপাদন খাতের জন্য পরিচিত হলেও এখন জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, জলবায়ু অর্থায়ন, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান জানান, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সেবা খাতের একটি আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা, নিয়মকানুন সহজ করা, কর ও ভ্যাট প্রশাসনে উন্নতি, মুনাফা দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশকে আরও পূর্বানুমেয় করার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়েও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ রিসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি করেছে। পাশাপাশি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ করার ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আরও যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম সার্বভৌম বন্ড ইস্যুতে জেপিমরগ্যানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তাঁর মতে, ওই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন রেফারেন্স তৈরি করেছে এবং দেশের পুঁজিবাজারকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়টিও বৈঠকে স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো দেশের বিষয়ে বিনিয়োগকারীরা শুধু বক্তব্য শুনেই সিদ্ধান্ত নেন না। তারা জানতে চান, নিয়মকানুন কতটা পূর্বানুমেয়, বিনিয়োগ কতটা সুরক্ষিত, মূলধন কতটা সহজে স্থানান্তর করা যায় এবং অর্জিত মুনাফা কতটা কার্যকরভাবে দেশে ফেরত নেওয়া যায়।
তারেক রহমান বলেন, নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা সরকারের দায়িত্ব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্বল্পমেয়াদি লেনদেনের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বকে গুরুত্ব দিতে চায়।
ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে ব্যবসা পরিচালনার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও দেশকে বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে তিনি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করতে, তাদের কথা শুনতে এবং যেখানে সম্ভব ব্যবসা পরিচালনার পথে থাকা প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রস্তুত। তিনি বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশ সফরেরও আহ্বান জানান।
নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বৈঠক ও কর্মসূচি ছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সফরে তিনি মোট ৩০টি সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!