দীর্ঘ অপেক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুন ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারির পর এবার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা ‘পে ফিক্সেশন’ অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ব্যবহার করা হবে সরকারের iBAS++ সিস্টেম। সরকারি মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের গেজেট অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ প্রকাশ করা হয়।

অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, পে ফিক্সেশনের সময় সরকারি কর্মচারীদের iBAS++-এর নির্ধারিত অপশনে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। তথ্য জমা দেওয়ার আগেই সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর জন্য নির্ধারণযোগ্য নতুন মূল বেতনের পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেখানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি আগের তুলনায় আরও বেশি ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় হবে।

নতুন ব্যবস্থায় গেজেটেড কর্মকর্তারা নিজেদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে iBAS++-এ প্রবেশ করবেন। অন্যদিকে নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে লগইন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিচয় যাচাই ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে পাঠানো ওটিপি ব্যবহার করতে হবে।

বিদেশে অবস্থানরত সরকারি কর্মচারীদের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে iBAS++-এ নিবন্ধিত ই-মেইল ঠিকানায় ওটিপি পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে। আর কোনো সরকারি কর্মচারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি না থাকলে পে ফিক্সেশন করার আগে তাকে এনআইডির জন্য নিবন্ধন করতে হবে। অর্থাৎ অনলাইনে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।

প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে পে ফিক্সেশনের তথ্য জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি এসএমএস পাঠানো হবে। এরপর জমা দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের জন্য তা সংশ্লিষ্ট ড্রইং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার বা ডিডিওর কাছে যাবে। অর্থাৎ কর্মচারী নিজে তথ্য জমা দিলেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে না; পরবর্তী পর্যায়ে দপ্তর ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হবে।

গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ডিডিও পে ফিক্সেশনের বেতন নির্ধারণী বিবরণী সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠাবেন। আর নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডিডিওকে সার্ভিস বহিতে আগের চাকরি ও বেতনের তথ্য যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। ফলে নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্মচারীর পূর্ববর্তী চাকরি ও বেতনসংক্রান্ত তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তথ্য যাচাই ও অনুমোদনের পর iBAS++ সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি করবে। এ পর্যায়ে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার ম্যানুয়াল স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে না। তবে কর্মচারীর সার্ভিস বহিতে ভেরিফিকেশন নম্বর এবং নতুন নির্ধারিত বেতন লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সেখানে স্বাক্ষর করতে হবে।

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে নেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দ্রুততার সঙ্গে একই নিয়মে বেতন নির্ধারণ করা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কর্মচারী নিজেই সিস্টেমে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার পর নতুন নির্ধারণযোগ্য মূল বেতন দেখতে পারবেন। এতে হাতে-কলমে হিসাবের প্রয়োজন কমবে এবং একই সঙ্গে তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও সহজ হবে।

তবে পে ফিক্সেশনের সময় তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবীদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। নাম, এনআইডি, জন্মতারিখ, চাকরিতে যোগদানের তথ্য, পূর্ববর্তী বেতন বা সার্ভিসসংক্রান্ত কোনো তথ্য ভুলভাবে দেওয়া হলে পরবর্তী যাচাইয়ের সময় সেটি সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নিজেদের সার্ভিস রেকর্ড ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে তারপর অনলাইনে তথ্য জমা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অনলাইনে পে ফিক্সেশনের এই বিধানের আইনি ভিত্তিও নতুন বেতন আদেশে রাখা হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে অনলাইনে বেতন নির্ধারণের বিধান রয়েছে। একই আদেশের গেজেট সরকারি মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বিশেষ গেজেট হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।

এর ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে ব্যক্তিপর্যায়ে বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন করা। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য iBAS++-ভিত্তিক এই প্রক্রিয়া চালু হলে কর্মচারীরা নিজেদের তথ্যের ভিত্তিতে নতুন মূল বেতন নির্ধারণের কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন করতে পারবেন। তবে পে ফিক্সেশন কখন থেকে সবার জন্য উন্মুক্ত হবে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে এর বাস্তবায়নের সময়সূচি কী হবে, সে বিষয়ে অর্থ বিভাগের পরবর্তী নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

নতুন এই ব্যবস্থায় কর্মচারীর তথ্য প্রবেশ, ওটিপির মাধ্যমে পরিচয় যাচাই, ডিডিওর যাচাই এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদন—সবকিছু একই ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে নবম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটিই আগের তুলনায় আরও দ্রুত, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং তথ্যনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র: বাংলাদেশ সরকারের মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের গেজেট এবং অর্থ বিভাগের নির্দেশনা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!