ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের অর্থের উৎস ও সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেশে-বিদেশে তাঁর সম্ভাব্য অবৈধ বিনিয়োগের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তে ফয়সাল, তাঁর স্ত্রী শাহেদা পারভিন সামিয়া এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ৫৩টি ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব হিসাব ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। পরে এসব হিসাবে থাকা অর্থ অবরুদ্ধের আদেশও দিয়েছেন আদালত।

এ ঘটনায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদাবর থানায় ফয়সাল ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ, তাঁর স্ত্রী শাহেদা পারভিন সামিয়া এবং আরও দুই-তিনজন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করেছে সিআইডি। মামলার নথিতে বলা হয়েছে, ফয়সালের কয়েকটি ব্যাংক হিসাব ও সেসবের মাধ্যমে পরিচালিত লেনদেন পর্যালোচনা করতে গিয়ে সম্ভাব্য অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়।

সিআইডির আর্থিক অপরাধ ইউনিট বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও বিনিয়োগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে। তদন্তে ফয়সালের ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

সিআইডির তদন্তে ফয়সালের একটি ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একটি বেসরকারি ব্যাংকের রূপনগর শাখায় হিসাবটি খোলেন তিনি। হিসাব খোলার সময় ব্যবসার ধরন হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি, পরামর্শসেবা ও প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়। বছরে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা লেনদেন হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হলেও পরবর্তী দুই মাসে ওই হিসাবে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা লেনদেন হয়।

তদন্তকারীদের মতে, ওই হিসাবে নগদ অর্থ উত্তোলনের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও অর্থ পরিশোধ ও স্থানান্তরের পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ব্যবসার ধরন, লেনদেনের প্রকৃতি এবং ব্যবসার অনুমতিপত্রে দেওয়া তথ্যের মধ্যেও অসঙ্গতি পাওয়ার কথা মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে ফয়সালের মালিকানাধীন অ্যাপল সফট আইটি ও পিনাকল সলিউশন ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে একটি চুক্তির তথ্যও পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, সরকারি তিনটি প্রকল্প যৌথভাবে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল প্রতিষ্ঠান দুটি। সিআইডির দাবি, পরবর্তী তদন্তে ওই প্রকল্পগুলোর দরপত্রের প্রস্তাব জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলে ফয়সালের ব্যাংক হিসাবে ৫৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা দেওয়ার তথ্যও তদন্তে এসেছে। এ ছাড়া ঠিকাদারি ব্যবসার আড়ালে জাল দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।

ফয়সালের বিদেশে সম্পদ ও বিনিয়োগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। সিআইডি জানিয়েছে, তাঁর সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাতায়াতের সুযোগসংবলিত পর্যটন ভিসা ছিল। ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশে ফেরেন। এখন দুবাইয়ে তাঁর কোনো সম্পদ বা বিনিয়োগ রয়েছে কি না এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর বা বিনিয়োগ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর ফয়সাল তাঁর স্ত্রীর নামে ৬৫ লাখ টাকার একটি এফডিআর করেন। এ অর্থের উৎস ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনও তদন্তের অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

এর আগে হাদি হত্যা মামলার তদন্তে ফয়সাল ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছিল সিআইডি। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, ৫৩টি ব্যাংক হিসাবে থাকা ৬৫ লাখ ৫০ হাজার ২৪৬ টাকা অবরুদ্ধ করার আবেদন করেছিল সিআইডি এবং আদালত তা অনুমোদন করেন।

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি। ছয় দিন পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরে এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান আসামি করা হয়। বর্তমানে তিনি ভারতে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

সিআইডির তদন্তে উঠে আসা ব্যাংক হিসাব, ব্যবসায়িক লেনদেন, এফডিআর এবং বিদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের তথ্যগুলো এখন মানি লন্ডারিং মামলার তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি, অর্থের উৎস এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে তদন্ত শেষে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!