পদ্মা সেতুর ভাটিতে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে মাগুখন্দ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনে ১২৮ দশমিক ৪৪ একর এলাকা থেকে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের কথা বলা হয়েছে। আবেদনটি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া চললেও প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ঠিকানা এবং যোগাযোগের তথ্য নিয়ে অনুসন্ধানে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

আবেদনে ঢাকার বছিলা মেইন রোডের ১১৫/১ নম্বর ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে অনুসন্ধান করে ওই ঠিকানায় ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। শুধু তা-ই নয়, আবেদনে দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে বালু উত্তোলনের আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানটির বাস্তব অস্তিত্ব ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি যে এলাকায় বালু তুলতে চায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রস্তাবিত এলাকাটি পদ্মা নদীর ভাঙনপ্রবণ অংশের মধ্যে পড়েছে। ওই অঞ্চলে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে সরকার বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এমন অবস্থায় নদীর তলদেশ থেকে পরিকল্পনাহীনভাবে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, তীরের স্থিতিশীলতা এবং ভাঙন পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন।

প্রস্তাবিত বালু উত্তোলন এলাকা পদ্মা সেতুর কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। পদ্মা সেতু দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর একটি। এর আশপাশের নদী ব্যবস্থাপনা ও তীর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিও অনুমোদনের আগে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

বালু উত্তোলনের বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএর কাছ থেকে অনাপত্তি নেওয়া হয়েছে বলে আবেদনের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অবস্থান সব সময় একই ছিল না। ভূমি মন্ত্রণালয় এক পর্যায়ে বিআইডব্লিউটিএর দেওয়া অনাপত্তি বাতিলের জন্য চিঠি দেয়। পরবর্তী সময়ে একই মন্ত্রণালয় শর্তসাপেক্ষে বালু উত্তোলনের প্রশাসনিক অনুমোদনে সম্মতি জানিয়ে আরেকটি চিঠি দেয়। ফলে অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।

তবে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আবেদনটি বর্তমানে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে নদীভাঙনের ঝুঁকি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএর মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শুধু নদীতে বালুর উপস্থিতি থাকলেই সেখানে ইচ্ছামতো বালু উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয় না। নদীর গতিপথ, তীরের অবস্থা, নৌযান চলাচল, পরিবেশগত প্রভাব এবং আশপাশের স্থাপনার নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বড় পরিসরে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে সতর্কতার কথা জানিয়েছেন। পুলিশ, মৎস্য ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে নদীভাঙন তীব্র হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। নদীর তলদেশের পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজনন ও জলজ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে বিরোধ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সম্ভাবনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এদিকে বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়ার আইনগত প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ জানিয়েছেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী বালুমহাল ঘোষণা করে টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারাদার নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। তবে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একই ধরনের প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া যাবে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধানের আলোকে নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ ‘আইকনিক সোর্সিং’-এর আবেদন গ্রহণ বা কোনো সংস্থার অনাপত্তি পাওয়াকে চূড়ান্ত ইজারা বা বালু উত্তোলনের অনুমতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বর্তমানে জেলা প্রশাসনের যাচাই-বাছাই শেষ হয়নি এবং চূড়ান্ত অনুমোদনও দেওয়া হয়নি বলে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্যের সত্যতা, প্রস্তাবিত এলাকায় বালু উত্তোলনের পরিবেশগত ও নদীভাঙন ঝুঁকি, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মতামত এবং প্রচলিত আইনে এমন অনুমোদনের সুযোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।

পদ্মা সেতুর আশপাশে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে যখন শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, তখন একই এলাকায় বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের আবেদনটি স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই দেখার বিষয়।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!