আজ ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব গণ্ডার দিবস। গণ্ডারের পাঁচটি প্রজাতি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এই প্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়। ২০১১ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব গণ্ডার দিবস পালন করা হচ্ছে।
পৃথিবীতে প্রায় ৫ কোটি বছর ধরে টিকে আছে গণ্ডার। দীর্ঘ এই সময়ে পরিবেশ ও জলবায়ুর নানা পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে বেঁচে থাকলেও মানুষের কর্মকাণ্ডে এখন প্রাণীটি গুরুতর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। অবৈধ শিকার, আবাসস্থল ধ্বংস এবং ছোট হয়ে আসা প্রজননক্ষম জনগোষ্ঠীর কারণে বর্তমানে বিশ্বে বন্য পরিবেশে গণ্ডারের সংখ্যা ২৭ হাজারেরও কম। আন্তর্জাতিক গণ্ডার ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার ৭০০। পাঁচ প্রজাতির মধ্যে চারটিই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্তমানে পৃথিবীতে গণ্ডারের পাঁচটি প্রজাতি টিকে আছে। এগুলো হলো সাদা গণ্ডার, কালো গণ্ডার, একশৃঙ্গ গণ্ডার, জাভান গণ্ডার ও সুমাত্রান গণ্ডার। সাদা ও কালো গণ্ডারের আবাস আফ্রিকায়। অন্য তিন প্রজাতি এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সীমিত পরিসরে টিকে আছে। অতীতে গণ্ডার আফ্রিকা ও এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলেও বিচরণ করত। এখন তারা মূলত আফ্রিকার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের সুরক্ষিত এলাকা এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধ।
আন্তর্জাতিক গণ্ডার ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বন্য পরিবেশে সাদা গণ্ডারের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার ৭৫২টি। কালো গণ্ডার রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৭৮৮টি এবং একশৃঙ্গ গণ্ডারের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৭৫টি। অন্যদিকে জাভান ও সুমাত্রান গণ্ডারের সংখ্যা কয়েক ডজনের মধ্যে সীমিত। সুমাত্রান গণ্ডার সবচেয়ে সংকটাপন্ন প্রজাতিগুলোর একটি।
গণ্ডারের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি অবৈধ শিকার। মূলত শিংয়ের জন্যই শিকারিরা গণ্ডার হত্যা করে। গণ্ডারের শিং কেরাটিন নামের প্রোটিন দিয়ে তৈরি, যে উপাদান মানুষের চুল ও নখেও রয়েছে। গণ্ডারের শিংয়ের বিভিন্ন তথাকথিত চিকিৎসাগত ব্যবহারের দাবি থাকলেও এর কার্যকারিতার পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবু অবৈধ বাণিজ্যে শিংয়ের চাহিদা প্রাণীটির ওপর শিকারের চাপ তৈরি করে যাচ্ছে।
শুধু শিকারই নয়, আবাসস্থল হারানোও গণ্ডারের জন্য বড় হুমকি। অনেক প্রজাতির সংখ্যা এত কমে গেছে যে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাভাবিক প্রজননও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে জাভান ও সুমাত্রান গণ্ডারের মতো অতি অল্পসংখ্যক প্রাণী টিকে থাকা প্রজাতিগুলোর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। আন্তর্জাতিক গণ্ডার ফাউন্ডেশনের হিসাবে, জাভান গণ্ডারের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং প্রজাতিটি আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
গণ্ডারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানোও সহজ নয়। একশৃঙ্গ গণ্ডারের গর্ভধারণকাল প্রায় ১৫ থেকে ১৬ মাস এবং সাধারণত দুই থেকে তিন বছর পর একটি করে বাচ্চা জন্ম নেয়। ফলে অতিরিক্ত শিকার বা আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে কোনো অঞ্চলে গণ্ডারের সংখ্যা কমে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে সেই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হয় না।
তবে গণ্ডার সংরক্ষণে কিছু আশার খবরও রয়েছে। সংরক্ষণ উদ্যোগের ফলে কালো গণ্ডার ও একশৃঙ্গ গণ্ডারের সংখ্যা গত কয়েক দশকে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক গণ্ডার ফাউন্ডেশনের হিসাবে, চলতি শতকের শুরু থেকে কালো গণ্ডারের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে এবং একশৃঙ্গ গণ্ডারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গণ্ডারকে তাদের ঐতিহাসিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব গণ্ডার দিবসে তাই পাঁচ প্রজাতির গণ্ডারকে টিকিয়ে রাখার জন্য অবৈধ শিকার বন্ধ, বন্যপ্রাণী পাচার রোধ, আবাসস্থল সংরক্ষণ, আইন প্রয়োগ জোরদার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রায় ২৭ হাজার গণ্ডারকে পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখতে শুধু শিকার বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়; তাদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা এবং অতি সংকটাপন্ন প্রজাতিগুলোর প্রজনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশ্ব গণ্ডার দিবস সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!