বাংলাদেশসহ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আটটি দেশের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চীন, আফগানিস্তান ও মিয়ানমার। হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া, পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি নরম হয়ে যাওয়া এবং হিমবাহ হ্রদের পানি বেড়ে যাওয়ায় ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা ও হিমবাহ ধসের আশঙ্কা বাড়ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের ১৮ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে এসব ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে ২৬ আগস্ট নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ হিমবাহ ও শিলাধসের পর আকস্মিক বন্যা হয়। ওই ঘটনার পর হিমালয়জুড়ে ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় নজরদারি ও প্রস্তুতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলটি আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তান পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। এই অঞ্চল থেকেই এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নদী ব্যবস্থার উৎপত্তি। এর পানির ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
গবেষকদের উদ্বেগের বড় কারণ হিমালয়ের হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র আইসিআইএমওডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত হিমবাহ গলে যাওয়ার হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছিল। একই সঙ্গে পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় পাহাড়ের ঢাল ও পাথরের স্তরের স্থিতিশীলতাও দুর্বল হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের ফলে ভূমিধস, বরফ ও পাথরের আকস্মিক ধস এবং হিমবাহ হ্রদের পানি উপচে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
সাম্প্রতিক একটি Systemiq প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আনুমানিক ৪০ হাজার হিমবাহের মধ্যে মাত্র ২১টি সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ অনেক এলাকার পরিবর্তন সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাওয়া কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি হিমবাহ পর্যবেক্ষণ করা বাস্তবসম্মত না হলেও জনবসতি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
ভারতেই প্রায় ২০০টি হিমবাহ হ্রদকে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি হ্রদকে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নিচের দিকে থাকা জনপদে আকস্মিক পানির ঢল নেমে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হিন্দুকুশ-হিমালয় থেকে উৎপত্তি হওয়া গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী বাংলাদেশের প্রধান নদী ব্যবস্থার অংশ। গঙ্গা ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নামে প্রবাহিত হয়েছে। আর তিব্বত থেকে উৎপত্তি হওয়া ব্রহ্মপুত্র চীন ও ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এসে যমুনা নামে পরিচিত। ফলে উজানের হিমবাহ, নদী ও পাহাড়ি পরিবেশে বড় পরিবর্তনের প্রভাব ভাটির দেশ বাংলাদেশেও পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক নেপাল-তিব্বত দুর্যোগ নিয়ে ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের গবেষণাতেও জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। গবেষকেরা বলেছেন, উষ্ণতা বাড়ার কারণে হিমবাহ ও পারমাফ্রস্টের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ায় এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো দুর্যোগের একক কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দেখার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক ও আবহাওয়াগত কারণও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে হিমবাহ ও নদীর ওপর উন্নত নজরদারি, দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ পাহাড়ি এলাকায় কোনো বিপর্যয় শুরু হলে তার প্রভাব সীমান্তের এক দেশের মধ্যে আটকে না থেকে নদীর প্রবাহ ধরে অন্য দেশেও পৌঁছাতে পারে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!