বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর মাস শেষে বিল হাতে নিয়ে অনেক গ্রাহকেরই প্রশ্ন, ব্যবহৃত বিদ্যুতের দামের বাইরে অতিরিক্ত টাকা কেন দিতে হচ্ছে। শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও ভ্যাট নিয়ে আপত্তি তুলছেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ও লোডশেডিংয়ের মধ্যে এসব নির্দিষ্ট চার্জ আদায় নিয়েই প্রশ্ন বাড়ছে।

আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল শুধু ব্যবহৃত ইউনিটের মূল্য দিয়ে তৈরি হয় না। ব্যবহারের পরিমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত স্ল্যাবে এনার্জি চার্জের পাশাপাশি ডিমান্ড চার্জ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মিটার ভাড়া, ভ্যাট এবং আগের বিল বকেয়া থাকলে বিলম্ব মাশুলও যুক্ত হতে পারে। ফলে একজন গ্রাহক মাসে যত টাকা মূল বিদ্যুতের জন্য খরচ করছেন, মোট বিল তার চেয়ে বেশি হওয়ার কারণ এসব অতিরিক্ত চার্জ।

বর্তমান আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সাতটি স্ল্যাব রয়েছে। ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযোজ্য স্ল্যাবের হারও পরিবর্তিত হয়। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪০০ ইউনিটের পর প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে পরবর্তী প্রতি ইউনিটের দাম ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট যুক্ত হয়।

এর বাইরে রয়েছে ডিমান্ড চার্জ। একজন গ্রাহকের অনুমোদিত বা নির্ধারিত লোডের ওপর এই চার্জ হিসাব করা হয়। বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট লোডে মাসে ৪২ টাকা করে ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও গ্রাহক বিলের কাঠামোয় উল্লেখ রয়েছে। ফলে দুই কিলোওয়াট লোডের গ্রাহকের ক্ষেত্রে মাসে এই খাতে ৮৪ টাকা এবং ১০ কিলোওয়াট লোডের ক্ষেত্রে ৪২০ টাকা দিতে হয়।

ডিমান্ড চার্জের ধারণাটি মূলত গ্রাহকের সংযোগ ও প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামো প্রস্তুত রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় ট্রান্সফরমার, বিতরণ লাইন ও সংযোগ সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নির্ধারিত এই ধরনের চার্জ নেওয়া হয়। ডিপিডিসির নথিতেও অনুমোদিত চাহিদার প্রতি কিলোওয়াটের বিপরীতে মাসিক নির্ধারিত চার্জের কাঠামোর উল্লেখ রয়েছে।

সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখনই, যখন গ্রাহকের অনুমোদিত লোড প্রয়োজনের তুলনায় বেশি থাকে। যেমন কোনো বাসায় বাস্তবে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার হলেও সংযোগের সময় বেশি লোড অনুমোদন করা হয়ে থাকলে সেই লোডের ভিত্তিতেই ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হলেও নির্দিষ্ট অংশের বিল অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

এর সঙ্গে মিটার ভাড়া যুক্ত হলে মোট নির্ধারিত খরচ আরও বাড়ে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গেল ফেজ প্রিপেইড মিটারের জন্য মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি-ফেজ মিটারের জন্য ২৫০ টাকা হারে ভাড়া নেওয়া হয়। ফলে বেশি লোডের সঙ্গে থ্রি-ফেজ মিটার থাকলে ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া মিলিয়ে মাসিক বিলের নির্দিষ্ট অংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর সরাসরি নির্ভর করে না।

প্রিপেইড মিটারে বিষয়টি আরও আলাদা করে চোখে পড়ে। এ ধরনের মিটারে টাকা রিচার্জ করার সময়ই নির্ধারিত কিছু চার্জ কেটে নেওয়া হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। ফলে গ্রাহক মিটার রিচার্জ করার পর দেখেন, জমা দেওয়া পুরো টাকা বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য থাকছে না। এ কারণেই অনেক গ্রাহকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর যুক্তি হলো, প্রিপেইড ব্যবস্থায় পোস্টপেইড বিলের তুলনায় লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ে এবং বকেয়া বিলের সমস্যা কমে। ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারে পোস্টপেইডের তুলনায় বাড়তি কোনো চার্জ নেওয়া হয় না; একই হারে ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ কাটা হয়। মিটার এককালীন কিনে না দিলে ভাড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রিপেইড গ্রাহকেরা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিলে ০.৫ শতাংশ রিবেটও পান।

দেশে প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার বিস্তার যে বাড়ছে, ডিপিডিসির সাম্প্রতিক তথ্যেও তার প্রতিফলন রয়েছে। সংস্থাটির এপ্রিল ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় প্রিপেইড মিটারের সংখ্যা এবং নতুন মিটার স্থাপনের হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে গ্রাহকদের একটি অংশের আপত্তি মূলত ব্যবস্থাটির গ্রহণযোগ্যতা ও চার্জের যৌক্তিকতা নিয়ে। নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রিপেইড মিটার নিয়ে সভা, সমাবেশ ও আন্দোলনের ঘটনাও ঘটেছে। নাগরিক অধিকার ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান মাসুমের অভিযোগ, গ্রাহকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ও গণশুনানি ছাড়াই প্রিপেইড মিটার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, অগ্রিম টাকা কেটে নেওয়া এবং বিভিন্ন চার্জের কারণে গ্রাহকেরা এ ব্যবস্থায় আস্থা পাচ্ছেন না।

ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলমও ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, মিটার পরিচালনা ও বিতরণব্যবস্থার খরচ কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা আরও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। তিনি ডিমান্ড চার্জের যৌক্তিকতা পর্যালোচনারও দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী মনে করেন, গ্রাহকের ক্ষোভের একটি বড় কারণ হলো নির্ধারিত চার্জের বিনিময়ে প্রত্যাশিত সেবা না পাওয়ার অনুভূতি। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকলে একই সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ নেওয়া নিয়ে গ্রাহকের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার উত্তর দিতে হলে চার্জের হিসাব আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। স্বাধীনভাবে হিসাব যাচাই বা অডিট করা হলে গ্রাহকদের আস্থা বাড়তে পারে বলেও মত দিয়েছেন অধ্যাপক হাসিব চৌধুরী। তবে তাঁর মতে, এর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করেই ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় এই চার্জ বাড়ানো হয়নি। প্রিপেইড মিটার নিয়েও সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি যাচাই করে কোনো সমস্যা পায়নি বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মিটার ভাড়ার বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও জানানো হয়েছে।

ফলে বিদ্যুৎ বিল বাড়ার পেছনে শুধু প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নয়, গ্রাহকের ব্যবহার, নির্ধারিত লোড, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া, ভ্যাট এবং বকেয়া থাকলে বিলম্ব মাশুল—সবগুলো বিষয়ই ভূমিকা রাখে। প্রিপেইড মিটারে এসব চার্জের কিছু অংশ আগেই কেটে নেওয়া হয়, আর পোস্টপেইড বিলে সেগুলো আলাদাভাবে দেখানো হয়। গ্রাহকদের চলমান প্রশ্নের বড় অংশ তাই বিদ্যুতের দাম নিয়ে যেমন, তেমনি এসব অতিরিক্ত চার্জের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়েও।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!